ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৫ এএম
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:২০ পিএম
ইলিশ। ছবি: সংগৃহীত
ভোলার আফতাব উদ্দীন ঢাকায় থাকেন প্রায় ১৫ বছর। এ সময়ে বছরে গড়ে ইলিশ কিনেছেন মাত্র ৩ বার করে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত দামের কারণে ইলিশ কেনা হয় না। যদিও আমাদের পূর্বপুরুষরা নদী থেকে প্রচুর ইলিশ ধরতেন। তেঁতুলিয়া নদীর তীরেই আমাদের বাড়ি। অন্যান্য নদীর চেয়ে তেঁতুলিয়ার ইলিশের স্বাদই অসাধারণ।
আফতাব উদ্দীন আরো বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত শুনে আসছি ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাধা হচ্ছে ডুবোচর, মেহেন্দি জাল ও চাইনা জাল। সরকার এসব জালের আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। এতে ইলিশের উৎপাদনে ভাটা পড়ছে।
গত ৬ মাসে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তরের প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তার সঙ্গে ইলিশ খাওয়া নিয়ে আলাপ হয়েছে প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা বিগত তিন বছর যাবত মৌসুমে ৩ দিনও ইলিশ কিনতে পারেননি।
ইলিশ নিয়ে যখন বাজারে এ অবস্থা ঠিক সেই মূহুর্তে আগামীকাল থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত শুরু হচ্ছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬। সপ্তাহটি উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তারমধ্যে রয়েছে আজ সোমবার সপ্তাহটি পালন উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন। বেলা সাড়ে ১১টায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি তুলে ধরবেন মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রী আমিন উর রশিদ।
ইলিশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে ইলিশের প্রধান ভরা মৌসুম সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর (আষাঢ়-আশ্বিন) মাস পর্যন্ত। তবে অক্টোবরেও বেশি মাছ পাওয়া যায়। এ সময়ে দক্ষিণ ও উপকূলীয় নদ-নদীতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। এই সময়ে ইলিশের স্বাদ ও চর্বি সর্বোচ্চ থাকে এবং দামও তুলনামূলক কম হয়।
ইলিশের প্রজনন, আহরণসহ ইলিশের বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের সাবেক প্রধান ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা জাটকা ধরে খেয়ে ফেলি। এতে করে ইলিশের উৎপাদন ব্যহত হয়। এদেরকে সর্বোচ্চ সহনশীল পর্যায়ে বড় হতে দিতে হবে। আমাদের শুধু উৎপাদন বাড়ালে হবে না বরং সহনশীল পর্যায়ে বাড়াতে হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, গত ৬ বছরের মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সবচেয়ে কম ইলিশ আহরণ হয়েছে। আর আহরণ কম হওয়ার অর্থ হচ্ছে- নদী ও সাগরে ইলিশের বৃদ্ধি কমে গেছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়টির সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছিলেন, আমরা বিগত বছরগুলোতে ইলিশের বৃদ্ধির একটি পরিসংখ্যান দেখেছি। আসল কথা হচ্ছে-এই পরিসংখ্যানে ইচ্ছা করে বেশি আহরণ দেখা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে নদী ও সাগরে ইলিশের বৃদ্ধি কমে গেছে। আমরা কমে যাওয়ার কারণ শনাক্ত করে গেলাম। আগামীতে যারা সরকারে আসবেন তারা যদি তা প্রতিকারে ব্যবস্থা নেন তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বলেছিলেন, ইলিশের প্রজননকালে সাগর থেকে নদীতে আসার পথে প্রচুর ডুবোচর। এসব চরে তাদের যাতায়াত সমস্যা হয়। এসব নদীগুলোর এসব চলে ড্রেজিং করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের ড্রেজিং করার কোন মেশিন নেই। এজন্য নৌপরিহন ও পানি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের উপর নির্ভর করতে হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বিগত ৬ বছরের মধ্যে কম ছিল। সে বছর উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৩২ হাজার ৭৯৫ টন, অর্থাৎ ৩ হাজার ৩০৮ টন কম।
২০২৫ সালের জুনের মাঝামাঝি জাটকা ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর বাজারে ইলিশের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির আশা করেছিল মৎস্য অধিদপ্তর। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, সে বছরের জুলাই ও আগস্টে ইলিশ আহরণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৩৩.২০ শতাংশ এবং ৪৭.৩১ শতাংশ কম ছিল। এই দুই মাসে ইলিশ আহরণ হয় মোট ৩৫ হাজার ৯৯৩.৫০ টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২২ হাজার ৯৪১.৭৮ টন (৩৮.৯৩ শতাংশ) কম। তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ইলিশ আহরণ ক্রমাগতভাবে কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের মোট আহরণ ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ১২ হাজার ৮৫৮ টন হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
২০২৪ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর (অন্তর্বর্তী সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়)। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্তরায় চিহ্নিত করতে তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সেসব বিষয় তিনি বলেন, ইলিশ একটি মাইগ্রেটরি ফিস। সাগর থেকে নদীতে আসার তার মাইগ্রেটরি রোট বিভিন্ন জায়গায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। কোন কোন জায়গায় সাগর থেকে নদীতে আসার পথে চর উৎপন্ন হয়েছে। আমার দায়িত্বপালন সময়ে কোন কোন নদীতে কোথায় কোথায় চর আছে তা নিয়ে সেটলাইট জরিপ করিয়েছিলাম। এসব চর খনন করে ইলিশের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার চলে আসার পর সেটি নিয়ে কোন কাজ হয়নি। এই প্রতিবেদন মৎস্য অধিদপ্তরে রয়েছে।
তিনি বলেন, সাগর থেকে মাইগ্রেট করে অভয়ারণ্যে মিঠাপানিতে আসার রাস্তাটি তার জন্য নিরাপদ নয়। সেখানে অবৈধ জাল, হারিয়ে যাওয়া জাল রয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হচ্ছে দূষণ। মেঘনায় এমনও দূষণ হচ্ছে যে নদীর নিচের কুচিয়া, কাকড়াও মারা যাচ্ছে। দূষণের কারণে প্রজনন স্থানগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ইলিশ মিয়ানমারের দিকে চলে যাচ্ছে। কখনো আবার সাগর থেকেই ফিরে যাচ্ছে।
সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময়ের পরেও আমরা দেখেছি পেটে ডিম আছে। তাই দেখা যাচ্ছে আমাদের এই নিষিদ্ধ সময়টা বিজ্ঞানভিত্তিক হয়নি। এটি আরো গবেষণা হওয়া দরকার। আরও কিছু টিউনিং করার দরকার আছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর মোহনায় লবণাক্তার পরিমাণ বাড়ছে। ইলিশ সেনসেটিভ প্রাণী এ কারণেও পথ বদলাচ্ছে। আমরা যতই জাটকা নিধন বন্ধের পদক্ষেপ নিচ্ছি না কেন গত বছরও লোকজন লাখ লাখ টন জাটকা নিধন করেছে। অর্থাৎ ইলিশের জন্য তার প্রজননক্ষেত্র নিরাপদ নয়। মাইগ্রেট রোডও নির্বিঘ্ন নয়। হয়ত প্রসব বেদনার জন্য সে এ পথে আসে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইলিশের মাইগ্রেট রোড ও অভয়াশ্রমে ডিম পেড়ে নির্বিঘ্নে জাটকা সাগরে ফিরে যেতে না দিলে ইলিশ হয়ত অন্য কোথাও চলে যাবে। যেখানে তার নিরাপত্তা রয়েছে। কেননা প্রত্যেক প্রাণিই তার সন্তানের নিরাপত্তা চায়। তিনি বলেন, ইলিশসহ অন্যান্য মৎস্য সম্পদ বাঁচানোর জন্য এখন খাল খননের চেয়ে নদী খনন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি বর্তমান সরকার সে দিকে দৃষ্টি দিবে।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে কী ধরনের কাজ করছে এ সম্পর্কে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ। আমাদের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে এপ্রিল ও মার্চ মাসে ৪০ হাজার জেলেকে ৫ লিটার সয়াবিন তেল, ৪ কেজি মসুর ডাল, ২ কেজি চিনি ও ২ কেজি লবণ, ৬ কেজি আটা ও ৮ কেজি আলু প্রত্যেক মাসে দেওয়া হচ্ছে। আর এই প্রকল্পটি এ বছরের জুনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সময় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের জন্য এসব অনুদানও বাড়ানো দরকার।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, ইলিশের যাতায়াতের জন্য পানির ন্যূনতম গভীরতা ৩ থেকে ১০ মিটার দরকার। কিন্তু মোহনা অঞ্চলে তা ২ থেকে ৩ মিটারে নেমে এসেছে। তা ছাড়া অতি আহরণ হচ্ছে। ১০০-২০০ গ্রাম বা ছোট ছোট ইলিশ ধরে ফেলা হচ্ছে। অভয়াশ্রমগুলোর কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে ইলিশের উৎপাদন প্রতিনিয়ত কমছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।