কবির হোসেন
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২০ এএম
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২০ এএম
মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতি। ছবি: সংগৃহীত
সড়ক-মহাসড়কের সংকট যেন কাটছেই না। সারা দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে সকাল-বিকাল ও রাতে গাড়ি আটকিয়ে অস্ত্রের মুখে মারধর করে সবস্ব লুট করছে দুর্বৃত্তরা। এসব ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনার ভিডিও প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্ব থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উপকরণ ও জনবল সংকট এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এদিকে সড়ক ও মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও ডাকাতির পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রাতে পর্যাপ্ত টহলের অভাব, নির্জন ও অন্ধকার সড়কে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয়তা বেড়েছে। পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাত নামলেই আতঙ্কে থাকেন তারা। সড়কের নিরাপত্তার ঘাটতি থাকায় সুযোগমতো বিভিন্ন যাত্রী পরিবহনে ও গাড়ি আটকে হামলা চালাচ্ছে ডাকাতরা।
সম্প্রতি সড়ক-মহাসড়কে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনা সামনে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস, কোনো যানই এখন নিরাপদ নয়। সংঘবদ্ধ ডাকাতরা কৌশলে রাস্তা অবরোধ করে বা চালকদের ভয় দেখিয়ে যানবাহন থামিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও ডাকাতির সময় মারধর, জিম্মি করে রাখার ঘটনাও ঘটছে।
গত ২৯ মার্চ নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা ব্যারাজ-জলঢাকা মহাসড়কে ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এদিন মধ্যরাতে ডিমলা থানার দক্ষিণ ঝুনাগাছ চাপানি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সম্পর্কিত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের আঁধারে মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী শতাধিক ট্রাক ও মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে চালক ও যাত্রীদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে অন্তত ৩৫টি মোবাইল ফোন এবং নগদ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা লুট করে নেয়। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা কয়েকটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর ও কয়েকজনকে মারধর করে বলে অভিযোগ করে ভুক্তভোগীরা। কয়েকজন গাড়িচালক জানায়, ২০ জনের বেশি ডাকাত অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। যারা গাড়ির জানালা খুলতে দেরি করেছে তাদের অনেকের গ্লাস ভেঙে যাত্রী ও চালকদের মারধর করেছে।
এর একদিন পর ৩১ মার্চ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নওগাঁও জেলার পোরশা থানার সরাইগাছী-খাট্টাপাড়া সড়কের ফকিরের মোড়সংলগ্ন একটি সেতুর ওপর রশি টানিয়ে সড়ক অবরোধ করে ডাকাতরা। এ সময় মোটরসাইকেলে যাওয়া তিনজন আরোহী ডাকাতদের কবলে পড়েন। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে থাকা আরও তিনজনকে একইভাবে জিম্মি করা হয়। পরে তাদের পাশের একটি আমবাগানে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়। ডাকাতরা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা, একটি স্মার্টফোন, তিনটি বাটন ফোন এবং ১২৫ সিসির দুটি ডিসকভার মোটরসাইকেল লুট করে নেয়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও নওগাঁর বিভিন্ন স্থান থেকে ডাকাতচক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। নওগাঁও পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
একই দিন সকাল ৭টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে চালককে গুলি করে সৌদিফেরত প্রবাসী দেলোয়ার হোসেনের গাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাড়িয়ারচর সেতুর ওপর এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ডাকাতরা পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও সৌদি রিয়ালসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়া চালক মো. ফিরোজ মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যায়, চাঁদপুরের পূর্ব জাফরাবাদ গ্রামের গাজী হাসান আলীর ছেলে সৌদি আরব প্রবাসী মো. দেলোয়ার হোসেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে চাঁদপুর যাওয়ার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আষাড়িয়ারচর ব্রিজের ওপর তাকে বহনকারী নোহা গাড়ি পৌঁছালে পেছন দিক থেকে ৪টি মোটরসাইকেল ও একটি প্রবক্স গাড়িতে অজ্ঞাত ১০-১২ জনের ডাকাত দল গাড়ির গতিরোধ করে। একপর্যায়ে চালকের সঙ্গে ডাকাত দলের ধ্বস্তাধস্তি হয়। পরে তাকে ডাকাত দলের এক সদস্য ডান হাতে এক রাউন্ড গুলি করে। সোনারগাঁ থানার ওসি মুহিববুল্লাহ বলেন, সংঘবদ্ধ ডাকাতদল ডাকাতি সংঘটিত করার চেষ্টাকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এতে তারা ডাকাতি সংঘটিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী প্রবাসী আহত হয়েছে এবং তাকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মহাসড়ক ও বাসাবাড়ি মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪৪১টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডাকাতির ঘটনায় ৬৩৮টি এবং দস্যুতার ঘটনায় ১ হাজার ৮০৩টি মামলা হয়েছে। তবে অনেক সময় এসব ঘটনায় মামলা হয় না বলে বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি। একই বছর সারা দেশের মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনের একটি তালিকা করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস-উত্তর) মো. রফিকুল হাসান গণি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে এবং সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের এখনও পুরোপুরি সংকট কাটেনি, জনবল ও গাড়ির স্বল্পতা রয়েছে। এসব সমস্যার ফলে দায়িত্ব পালনে গতি বাড়ছে না। এই পুলিশ কর্মকর্তার মতে, গাড়ি মানে সাধারণ গাড়িই আপাতত প্রয়োজন। হাইস্পিড গাড়ির খুব বেশি জরুরি না। তিনি দাবি করে বলেন, অভিযানে শতভাগ সফলতা না গেলেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, হাইওয়েতে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে তাদের জনবল ও উপকরণে ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত সময়ে এ ঘাটতিগুলো পূরণ না হলে, সামনের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষ যেকোনো সময় বিপদের মধ্যে পড়বে। এই ঘাটতি এ সুযোগটাই অপরাধীরা নেবে। তার মতে, পুলিশের যেসব ইউনিটকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় এর মধ্যে হাইওয়ে পুলিশ অন্যতম, কিন্তু সেটি মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, হাইওয়ের পুরোটাই প্রযুক্তির মাধ্যমে মনিটরিং করার আওতায় নিয়ে আসা দরকার। এ ছাড়া আমরা বলছি যেসব স্পটগুলো বেশি অপরাধপ্রবণ মনে হয় সেসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণে সিসিটিভি মতো প্রযুক্তির নির্ভর ও এলাকায় পুলিশি সোর্স তৈরি করতে পারে।