বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩০ এএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩২ এএম
সচিব রদবদল ও তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশে প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক সমন্বয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নতুন সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের শুরুতেই একের পর এক সিদ্ধান্ত প্রদান, সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরেই তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ, আবার পুনর্বহালÑ এমন সব পদক্ষেপের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখতে পাচ্ছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অতি সম্প্রতি সচিব পর্যায়ের রদবদলের কারণে যেভাবে বারবার প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিল হয়েছেÑ তাতে সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আসলে প্রশাসন চালাচ্ছে কারা? সরকারের ভেতরে কি একাধিক শক্তিকেন্দ্র সক্রিয়Ñ এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা। সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রশাসনের ভেতরে আরেক প্রশাসন এভাবে দুষ্টক্ষত তৈরি করেছিল; সচিব, জেলা প্রশাসক, এসপি নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার গঠনের পরও সেই ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হওয়ায় চলছে নানা সমালোচনা।
প্রসঙ্গত গত ২৫ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সচিব পর্যায়ের ১২ জনের বড় ধরনের রদবদল হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কার্যকর হওয়ার আগেই বা কার্যকর হওয়ার পরপরই একাধিক প্রজ্ঞাপন স্থগিত বা বাতিল করা হয়, যা প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ওই দিনের প্রজ্ঞাপনে পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবকে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তারা হলেনÑ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) জাহেদা পারভীন এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এই পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের প্রজ্ঞাপন একই দিনেই বা পরদিন স্থগিত করা হয়। এরপর তাদের আগের পদে বহাল করা হয়। ফলে যাদের নতুন করে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের নিয়োগও বাতিল হয়ে যায়। এভাবে একই দিনে প্রজ্ঞাপন জারি করে আবার স্থগিত করা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ভালো বার্তা নয়, বরং সমন্বয়হীনতার দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৫ মার্চের এ ঘটনাপ্রবাহ এখানেই থেমে থাকেনি। ২৯ মার্চ আবারও দুই সচিবকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরীকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাদের স্থলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে সচিব করা হয় কানিজ মওলাকেÑ যিনি এর আগে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে ২৫ মার্চ তাকে আইএমইডি বিভাগে সচিব পদে বদলি করা হয়েছিল। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আশরাফুল ইসলামকে। এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়াকে ২৫ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব করা হলেও, কয়েক দিনের মধ্যে আবার তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) হিসেবে বদলি করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। কেউ কেউ এই ধারাবাহিক রদবদলকে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও আলোচনা-সমালোচনা থেমে নেই।
তাছাড়া এই ঘনঘন পরিবর্তন প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “আজ যে পদে আছি, কাল সেখানে থাকব কি নাÑ এই অনিশ্চয়তা প্রশাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। নিয়োগের আগে যাচাই না করে পরে বাতিল করা হলেÑ তা শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করে।”
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে প্রশাসনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কি কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করছে? সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ‘যদি একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা বা দিনের মধ্যেই সেটি বাতিল করতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি আছে।’ তাদের মতে, ‘এতে একদিকে প্রশাসনের ভাবমূর্তির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতিও তৈরি হচ্ছে।’
একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এভাবে সিদ্ধান্ত রদবদলে তিনটি কারণের ভূমিকা থাকতে পারেÑ প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চাপ তথা বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব; এবং তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।”
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “একই দিনে সচিবদের বদলি করে আবার তার মধ্য থেকে কয়েকজনের আদেশ স্থগিত করা নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন। এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। সরকারের ভেতরে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের একাধিক কেন্দ্র থাকে এবং সমন্বয় না থাকে, তাহলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে প্রশাসনের শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এবং কর্মকর্তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।” তার মতে, “যেকোনো সরকারকে প্রথমেই একটি সুসংহত কমান্ড স্ট্রাকচার নিশ্চিত করতে হয়। না হলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারেÑ প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা, নীতিনির্ধারণে বিলম্ব ও জনসেবায় নেতিবাচক প্রভাব। জনপ্রশাসন যদি স্থিতিশীল না থাকে, তাহলে সরকারের নীতিও স্থিতিশীল থাকে না। তাদের মতে, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সচিবদের বদলি, সংযুক্তি, পুনর্বহাল এবং প্রজ্ঞাপন বাতিলের ঘটনাগুলো নতুন সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষ আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন জারি এবং তা দ্রুত স্থগিত করার এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব নির্দেশ করে। বিগত সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়ে নতুন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয়। যোগ্যতা ও প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা কাজ করছে কি নাÑ এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা কার্যকর না হয়, তাহলে বোঝা যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং বাস্তবায়নকারী একই জায়গায় নেই। প্রশাসন চালাতে হলে স্পষ্ট কমান্ড চেইন দরকার। এখানে সেটা দুর্বল মনে হচ্ছে।’