ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম
পুলিশের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে একটি সংগঠিত ‘অদৃশ্য চক্র’ সক্রিয় হয়ে উঠেছেÑ এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পেশাদারত্বের বদলে রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ আর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এতে শুধু কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে না, বরং সামগ্রিকভাবে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের একটি প্রবণতা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আগে যাদের বিএনপি বা জামায়াত-শিবির ঘনিষ্ঠ বলে চিহ্নিত করা হতো, এখন তাদের কাউকে কাউকে আবার উল্টোভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’ ছাপ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। আসন্ন পদায়ন ও পদোন্নতি ঘিরে কয়েকটি ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য এমন নেতিবাচক চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ কাঙ্ক্ষিত পদায়ন না পাওয়া বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে তারা একটি গোষ্ঠী তৈরি করে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের বিব্রত করার চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় পুলিশ অধিদপ্তর থেকে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনায় অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির করা থেকে বিরত থাকতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পদায়ন ঘিরে ‘ট্যাগ’ রাজনীতি
ভুক্তভোগী কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বাহিনীতে রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের কেউ কেউ বিএনপি বা জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত করে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করেছিল। আবার বর্তমানে বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিছু কর্মকর্তাকেও শিবিরপন্থী বলে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। কিন্তু এখন যে কেউ সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতি তৈরি হচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, এ ধরনের অপপ্রচারের কারণে জেলা পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও রেঞ্জ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অজানা শঙ্কা কাজ করছে। যেকোনো সময় অপপ্রচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর নতুনভাবে ট্যাগ সংস্কৃতি চালু হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একইভাবে উদ্দেশ্যমূলক ট্যাগ দিয়ে অনেক দলনিরপেক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করা হয়। এমনকি পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। তখন একপক্ষ বিএনপিপন্থী বা আওয়ামী সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এখন একইভাবে বিভিন্ন ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যমূলক বিএনপিবিরোধী বলে কোণঠাসা করা হচ্ছে। অথচ তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছিলেন।
অন্য একটি সূত্র বলছে, এসব অপপ্রচারে নেপথ্য ভূমিকা রাখছেন ২২ ও ২৫তম ব্যাচের কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো তারা একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে। পুলিশ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলেও তারা প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। কখনও কখনও পুলিশপ্রধানকে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ গত ৫ আগস্টের পর এদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে পদায়ন সংক্রান্ত দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ আগে থেকেই বিভাগীয় মামলায় জড়িত ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাঙ্ক্ষিত পদায়ন না পাওয়ার কারণে তারা একটি গোষ্ঠী তৈরি করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দিচ্ছেন এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাদের হেয় করার চেষ্টা করছেন। এদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিভাগীয় মামলার কারণে পদোন্নতি আটকে যায়। পরে তিনি নিজেকে বঞ্চিত দাবি করে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে ঢাকার কাছাকাছি একটি জেলার সাবেক পুলিশ সুপার, যিনি দুর্নীতির অভিযোগে কয়েক মাস আগে প্রত্যাহার হন, তিনিও এই অপপ্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ে তদবির বন্ধে কড়াকড়ি
সূত্র জানায়, পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে তদবিরের অভিযোগ ওঠায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৯ মার্চ জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, কিছু পুলিশ সদস্য অফিস চলাকালে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির করছেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ ধরনের তদবিরের কারণে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রত হচ্ছেন। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন সরকারি কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
অনুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না এবং পদোন্নতি বা অন্য কোনো বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় তদবির করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির করা একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি। এতে বাহিনীর শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
সূত্র বলছে, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে ডেকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সতর্কবার্তার পরও আচরণে পরিবর্তন না আসায় তাদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রচার শুরু করেন।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তারা বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে কাল্পনিক দুর্নীতি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। এমনকি কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতিও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে ২০তম ব্যাচের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই কিছু কর্মকর্তা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বিব্রত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশও ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
পুলিশ ও প্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে গোষ্ঠীবাদ বা রাজনৈতিক ট্যাগিং দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি করতে পারে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশের মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে যদি গোষ্ঠীভিত্তিক দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক ট্যাগিং শুরু হয়, তাহলে তা পেশাদারত্বের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ প্রতিদিনের বাংলাদেশ বলেন, পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটিকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার বা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা বাহিনীর ঐক্যকে দুর্বল করে দেয়। শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পুলিশ সদর দপ্তরের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং প্রয়োজনে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই চক্রের অপতৎপরতা বন্ধ করা না গেলে বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। এতে পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।