আরমান হেকিম
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৯ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৫ এএম
সচল হচ্ছে এমপিদের ‘ইচ্ছেপূরণ প্রকল্প’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকার ধর্মীয় স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। প্রকল্পটি শুরু থেকেই এমপিদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। কাগজে-কলমে প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছিল ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন’, তবে বাস্তবে এটি পরিচিতি লাভ করে ‘এমপিদের ইচ্ছেপূরণ প্রকল্প’ নামে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) তা বাস্তবায়ন করেনি। প্রায় এক বছর পর প্রকল্পের ব্যয় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা এবং মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করার সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় তারা। সংশোধনী প্রস্তাবে নানা খাতের বিতর্কিত ব্যয় ও পরিকল্পনা নিয়ে কমিশন আপত্তি জানায়। এই বিতর্ক এবং প্রকল্পের নানা জটিলতা নিয়েই নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভায় এটি উঠছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আগামী সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র জানায়, ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ শীর্ষক প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা, প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে এবং মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি যেকোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। তবে এই প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু কাজের প্রাক্কলন সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। আইএমইডি বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিরোধ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমজাতীয় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের মাধ্যমে এমপিরা নিজেদের মতো করে মসজিদ, মন্দিরÑ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নেতাদের নিজস্ব কবরস্থানের উন্নয়নও করেছেন। তবে অনেক জায়গায় কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি কাজের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার চকপাড়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন একটি নতুন জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৩৮ লাখ টাকা, কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েকটি খুঁটি বসিয়েই ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবায়িত কাজের খরচ প্রকৃতপক্ষে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
জানতে চাইলে প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক নাজমুল করিম জানিয়েছেন, স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সরকার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করতে চেয়েছে, তাই সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাবের নানা খাত নিয়ে আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের। আপত্তিতে বলা হয়েছে, বেতন-ভাতা খাতে ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, আউটসোর্সিংয়ে ১০ কোটি ৪৬ লাখ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ৫ কোটি, পেট্রোল-লুব্রিক্যান্ট খাতে ৯০ লাখ, ভ্রমণ ব্যয় ৭০ লাখ, সম্মানী খাতে ১ কোটি ২১ লাখ এবং মোটরযান মেরামত খাতে ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। এক বছরের জন্য এত বড় ব্যয়কে অযৌক্তিক হিসেবে দেখেছে কমিশন।
প্রকল্পটির এলাকাভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়, আর সবচেয়ে কম মেহেরপুরে। চট্টগ্রাম জেলায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে মেহেরপুরে সর্বনিম্ন মাত্র ৫ কোটি টাকা। কমিশন এই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এলজিইডি বলছে, চলমান প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি এলজিইডির ২০২০-২১ অর্থবছরের দর তালিকা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল। এরপর নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর ও শ্রমিকের মজুরি বহু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ২০২২ সালের জুনে এলজিইডির বিভাগীয় দর তালিকা একবার সংশোধন করা হয়। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেটি আরও হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে বছরভিত্তিক প্রকৃত খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা ভাতা ঘোষণার কারণে নতুন ইকোনমিক সাবকোড অন্তর্ভুক্ত করাও সংশোধনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।