× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন পথ খুঁজছে সরকার

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০০ এএম

ঝুলছে ‘অকটেন নাই’ নোটিস। বৃহস্পতিবার ঢাকার টিকাটুলীর একটি পাম্পে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঝুলছে ‘অকটেন নাই’ নোটিস। বৃহস্পতিবার ঢাকার টিকাটুলীর একটি পাম্পে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, ডলারের চাপ এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আবারও চাপে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত প্রস্তাব বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় সম্মতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি, ব্যবহার দক্ষতা এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসারে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হচ্ছেÑ ‘কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো।’ 

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম ওঠানামা করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, সরবরাহে ঘাটতি এবং বাজারে অনিশ্চয়তার আভাসÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করছে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সামনের দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে সমন্বিত প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর। যদিও বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তবুও অনেকে এখনও আশাবাদী যে পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে যাবে না।

বৈশ্বিক বাজারের চাপ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তাÑ সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল নয়। যদিও কিছু সময় দাম কমছে, আবার হঠাৎই বেড়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে সামান্য পরিবর্তনও তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

সূত্র জানায়, পরিকল্পনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গ্যাস ও এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সোলার ও বায়ু) এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ আমদানির ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এলএনজি আমদানি কৌশলে পরিবর্তন হিসেবে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আমদানির প্রস্তাব থাকছে। এতে দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পুরনো ও অদক্ষ কেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করে উচ্চ দক্ষতার আধুনিক কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা ধাকবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জ্বালানি ব্যবহার দক্ষ হবে। চাহিদা ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্মার্ট মিটারিং ও টাইম-অফ-ইউজ ট্যারিফ চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি ও বিনিময় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ আমদানি বাড়ালে খরচ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আর্থিক চাপ কমানোর কৌশল

সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টিও এই প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের দিকে এগোনো হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ না বাড়াতে বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিযুক্ত ট্যারিফ চালু রাখার বিষয়টিও প্রস্তাবনায় রাখা হচ্ছে। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর

সমন্বিত প্রস্তাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান খুবই কম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে চায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সৌরবিদ্যুৎই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল, সৌরপার্ক এবং শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে জোর দেওয়া হবে। তবে এই সমন্বিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো।

তারা আরও বলেন, পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই মূল বিষয়। দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও এটি কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক। এই সমন্বিত প্রস্তাব যদি বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে করা হয়, তাহলে এটি গেম চেঞ্জার হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। যতদিন পর্যন্ত আমরা নিজস্ব জ্বালানি উৎস বিশেষ করে নবায়নযোগ্য খাত বিস্তৃত করতে না পারব, ততদিন এই সংকট বারবার ফিরে আসবে। সরকার যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে এর বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, এলএনজি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমানো একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে। তবে একই সঙ্গে আমাদের উচিত জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, কারণ সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি হলো সাশ্রয় করা জ্বালানি।

সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্রমতে, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা নিয়ে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভায় আলোচনা করা হয়। নীতিগত এটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। এখন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, এমন উদ্যোগ সফল হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। একই সঙ্গে কমবে আমদানিনির্ভরতা এবং বাড়বে নিজস্ব সক্ষমতা।

সূত্রমতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থনীতি ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। সমন্বিত এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারেÑ এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার অধীনে মোট ১ হাজার ৮৩৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র সচল রয়েছে। গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৩১ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা আরও ৬ হাজার ২৫৫ এমভিএ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

আরেক জ্বালানি বিশ্লেষক শামসুল আলমের মতে, বাংলাদেশে এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। অনেক সময় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে, যার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এই প্রবণতা বন্ধ না করলে অর্থনৈতিক চাপ কমানো কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে আরও আকৃষ্ট করতে হবে। এজন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা