জ্বালানি তেল
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৩ এএম
ডিজেল সংকটে পণ্যবাহী লাইটার জাহাজগুলো বন্দরে অলস সময় কাটাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জ বন্দর শিল্পাঞ্চল থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি-২০০৪ অনুযায়ী দেশের জন্য ৬০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুদ রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছেÑ যাকে বলা হয় কৌশলগত মজুত। এই কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে না পারার কারণে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসের মাঝামাঝিতেই জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসি কৌশলগত মজুত যদি নিশ্চিত করত তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এত দ্রুত দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে পড়ত না। তাই এই সংকটকে মাথায় রেখে সরকারকে জ্বালানি তেল মজুদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন তারা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের মজুদ সক্ষমতা অবশ্যই বাড়ানো উচিত। ইরান যুদ্ধ আমাদের সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। শুধু জ্বালানি তেল নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎÑ সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন, মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদি এটি না করা হয়, তাহলে আমরা বারবারই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু তেলের ওপর নির্ভর করে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস সব জায়গায় সক্ষমতা বাড়ানোর এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পলিসিতে এটি কখনও অগ্রাধিকার পায়নি। ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এত বছরেও সেটি হয়নি।’
ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি-২০০৪ অনুযায়ী আপৎকালীন ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ২০২০ সালে মজুত সক্ষমতা ৬০ দিনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি বিভাগ। ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ৬ বছর পার হলেও সেটি নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। ছয় বছর আগে যেই তেল মজুতের সক্ষমতা ছিল, সেই আগের অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে বিপিসির তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৪৫ দিনের মতো।
পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড পিএলসির তিন কোম্পানির মাধ্যমে বিপিসি সারা দেশে তেল বিপণন করে। তিনটি বিপণন কোম্পানির বিপণন নেটওয়ার্কে ২ হাজার ৩২৯টি ফিলিং স্টেশন, ২ হাজার ৬৪৩টি এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটর, ৬৬৭টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার, ২ হাজার ৭৪৭টি এলপি গ্যাসের ডিলার, ১৩৯টি মেরিন ডিলার ও ১৭টি বাংকার ডিলার রয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, তিনটি বিপণন কোম্পানিসহ বর্তমানে দেশে বিপিসির আওতাধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিতভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা প্রায় ১৩ লাখ ৪১ হাজার টন। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত মিলে তেল মজুত সক্ষমতা আছে ৫ লাখ ২১ হাজার টন, পদ্মা অয়েল পিএলসির মজুত সক্ষমতা ৩ লাখ ৮ হাজার টন, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ২ লাখ ৪৬ হাজার টন এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ২ লাখ ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা রয়েছে।
এই ১৩ লাখ ৪১ হাজার টনের বাইরে সম্প্রতি আরও ২ লাখ ৪০ হাজার টন মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পের অধীনে কক্সবাজারে মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া এলাকায় পরিশোধিত তেল মজুতের জন্য তিনটি এবং অপরিশোধিত তেল মজুতের জন্য তিনটি ট্যাংক নির্মাণ করা হয়। এই ছয়টি ট্যাংকের মধ্যে পরিশোধিত তেলের জন্য তৈরি করা প্রতিটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার টন। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল মজুতের জন্য নির্মিত প্রতিটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার টন।
এই হিসাবে বিপিসি চাইলে সংস্থাটির আওতাধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিপোতে ১৫ লাখ টন তেল মজুত রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সেটি হয়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মার্চ দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন। অন্যদিকে পেট্রোল আর অকটেনের মজুত ছিল ২৬ হাজার টন। দৈনিক ১২ হাজার টন চাহিদা অনুযায়ী, ওই সময় দেশে ডিজেল মজুত ছিল মাত্র ১৪ দিনের। অন্যদিকে দৈনিক ১ হাজার ৪০০ টন চাহিদা অনুযায়ী ওই সময় পেট্রোল মজুত ছিল ১৮ দিনের এবং দৈনিক ১ হাজার ২০০ টন চাহিদা অনুযায়ী ওই সময় অকটেনের মজুদ ছিল ২১ দিনের।
২০২০ সালে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হলেও এখনও কেন সেটি বাস্তবায়ন হয়নি এ সম্পর্কে জানতে চাইলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারছি না। জ্বালানি আমদানি এবং সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, আপনি এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান অথবা পরিচালক অপারেশনের সঙ্গে কথা বলুন।
পরে এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভি করেননি। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) একে মোহাম্মদ সামছুল আহসানকে কল করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এরপর প্রতিষ্ঠানটির সচিব শাহিনা সুলতানার সঙ্গে কথা বলার পর তিনিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শাহিনা সুলতানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তেল মজুতের বিষয়টি আমাদের অপারেশন্স বিভাগ দেখে। এ বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন।’