জুলাই সনদ বাস্তবায়ন
দীপক দেব
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৩ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৬ এএম
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়েছে সরকারি দল ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়েছে সরকারি দল ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে। বিরোধী দলের প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না আসাই রাজপথে আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে বিরোধী দলের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সরকারি দলের পক্ষ থেকে নতুন করে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার নির্ধারিত সময় শনিবার বিকালে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারি দলের দায়িত্ব গ্রহণের ৪৪ দিনের মাথায় রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দিল বিরোধীদলীয় জোট। অনেকেই মনে করছেন, জুলাই সনদ ইস্যু নিয়ে নতুন করে রাজপথে গড়াচ্ছে আন্দোলন।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন তথা গণভোটের আলোকে সংস্কার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে এড়িয়ে যাওয়ার যে সুযোগ ছিল তাকে কাজে লাগানোটা উচিত ছিল। এতে করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে সরে এলে রাজনীতিতে সংকট সৃষ্টি হওয়ার কথা, সেটাই হচ্ছে। বিরোধীদের এই আন্দোলনের মাধ্যমে বড় ধরনের সংঘাত বা সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকলেও ছোট্ট একটা ভুল থেকে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনের যে ধারা শুরু হতে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকবে। যেটা সরকারি দল বা বিরোধী দল সকলের জন্য, এমনকি দেশ ও জনগণের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। বিষয়টি সব পক্ষের উপলব্ধিতে রেখে পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের একটি স্তর ছিল গণভোট। আদেশ অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়নে চলতি সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করার কথা। এটাই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। কিন্তু এখনও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি। যে আদেশের বলে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা রাষ্ট্রপতি দিতে পারেন না বলে এরই মধ্যে সংসদে তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সারা জাতির মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কার চায় না বা বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। এই সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আমরা ধারণ করি। কিন্তু যে আদেশটি (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ) নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, সেটি আমরা মানছি না, কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সাথে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সাথে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না।’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে আলোচনার জন্য ২৯ মার্চ মুলতবি প্রস্তাব এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সরকারি দলÑবিরোধী দল কমিটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। পরদিন সরকারি দলের প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের ঘোষণা ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব আনার প্রতিবাদে বুধবার ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। একই সঙ্গে রাতে আন্দোলনের ঘোষণাও দেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে বিরোধীদলীয় জোটের পক্ষ থেকে।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য সরকারি দলের পক্ষ থেকে আনা মুলতবি প্রস্তাবটির ওপর ৫ এপ্রিল শনিবার আলোচনার জন্য ২ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বুধবার জাতীয় সংসদে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী দাবি আদায়ে পরদিন বৃহস্পতিবার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে বিরোধীদলীয় জোট। সরকারি দলের মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জন্য নির্ধারিত দিন ও প্রায় একই সময় এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে রাজধানীর গুলশানের একটি বাসায় ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার বিকালে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে এ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সরকার যদি সংসদে গণভোটের সমাধান না করে, তাহলে ১১ দলের উদ্যোগে শনিবার বিকাল ৫টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। এ ছাড়া গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনমত গঠনের চেষ্টা করবে বিরোধী দল। একই সঙ্গে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করা হবে। এরপরও সরকার জনমতকে উপেক্ষা করলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বিরোধী দল।
এদিকে গতকাল রাজধানীতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘গণভোটের আলোকে জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি : সরকারের দায় ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সেমিনারে বিএনপির সমালোচনা করেন জাতীয় সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জনগণের ত্যাগের প্রতিফলন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে একটি পক্ষ ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করছে। যে যুক্তিতে জুলাই সনদ বা অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সেই একই যুক্তি শেষ পর্যন্ত জুলাই বিপ্লব, বর্তমান সরকার এবং এই সংসদকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নানা ধরনের ভুলত্রুটি ছিল তারপরও একটা পদ্ধতিগত জায়গা থেকে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ ও সংস্কার নিয়ে একমত হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে কেউ সরে গেলে সেখানে সংকট সৃষ্টি হওয়ারই কথা, সেটাই দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে আন্দোলন ঘোষণা করা হয়েছে সেখান থেকে হয়তো বড় ধরনের সংঘাত হবে না। তবে ছোট্ট একটা ভুল থেকে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হওয়ার ইতিহাস আমাদের রাজনীতিতে রয়েছে। এজন্য আমি মনে করি এই আন্দোলনে বড় কিছু না হলেও সেটা অব্যহত থাকবে এবং এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনের পথে রাজনীতি ঢুকে যাচ্ছে। যেটা সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ ছিল সেটা না করে বিষয়টি রাজপথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হলো বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
এ প্রসঙ্গে সরকারি দলের ভূমিকার সমালোচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সরকার শুরু থেকে সংসদে এবং অন্যান্য কার্যক্রমে জুলাই সনদ এবং গণভোটকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কথা বলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। যখন কথা বলার সুযোগ চেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে নোটিস দিলেন; তখন সেটাকে নিয়েও একধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলো এবং তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো। তো জুলাই গণঅভ্যুত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোটের যে জনরায়; সেই জনরায়কে সরকার একধরনের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে এবং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।