প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৫৬ পিএম
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১২ পিএম
ফাইল ফটো
নুতন সরকারের মাঠ প্রশাসনে পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেশের চার জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তটি এসেছে রংপুর জেলার ডিসির বিরুদ্ধে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে এই ডিসি ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ এনামুল আহসানের বিরুদ্ধ। অথচ কোনো দৃশ্যমান তদন্ত ছাড়াই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার পরিবর্তে নতুন ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ রুহুল আমিন। একই সঙ্গে রাজবাড়ী জেলা, পাবনা জেলা এবং ঠাকুরগাঁও জেলায়ও নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বুধবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা করা হয়। তবে রংপুরের ডিসিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তদন্ত ছাড়াই তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলো হয়েছে, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) পরিচালক (উপসচিব) আফরোজা পারভীনকে রাজবাড়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল হককে ঠাকুরগাঁও ও আমিনুল ইসলামকে পাবনা এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে রংপুরের ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ ১১ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এছাড়া প্রত্যাহার করা চারজন ডিসিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভেতরে এটিকে নিয়মিত বদলি হিসেবে দেখানো হলেও রংপুরের ঘটনাটি যে ব্যতিক্রম তা স্পষ্ট। কারণ এখানে একটি বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন এসেছে।
রংপুরে নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুরে সৃষ্ট উত্তেজনা এখনো থামেনি। বিশেষ করে রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) ও পীরগঞ্জ আসনে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে তার পরাজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তার দাবি, প্রশাসনের একটি অংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি এবং ভোটের দিন ‘মব সৃষ্টি’ করে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ভোট বাতিলের বিষয়টি।
তার ভাষায়, “যেখানে ব্যবধান কম, সেখানে এত বিপুলসংখ্যক ভোট বাতিল হওয়া স্বাভাবিক নয়”।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী উজ্জ্বল চন্দ্র রায়ও। তার মতে, ভোটগ্রহণের দিন উপস্থিতি ভালো থাকলেও গণনার সময় স্বচ্ছতার অভাব ছিল।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তৎকালীন ডিসি ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ এনামুল আহসান। বিএনপি ও অন্যান্য প্রার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের একটি অংশ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে।
রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু এবং রংপুর-৬ আসনের সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় কাজ করেছেন। তাদের দাবি, পোলিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগেও পক্ষপাতিত্ব ছিল।
এমনকি অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন চলাকালে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এসব বিষয় মিলিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই রংপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও সমমনা দলের প্রার্থীরা ডিসি কার্যালয় ঘেরাও করে প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগানে প্রতিবাদ জানান, যেখানে ডিসিকে ‘ভোট চোর’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করার মতো গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়।
পরে প্রার্থীরা ডিসির সঙ্গে দেখা করতে গেলেও অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয়নি। এতে ক্ষোভ আরও বাড়ে।
তদন্ত ছাড়াই প্রত্যাহার, প্রশ্নের মুখে সিদ্ধান্ত
এতসব গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট ডিসিকে প্রত্যাহার করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যায়নি। এতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রত্যাহার নয়-অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
আস্থার সংকট নাকি রুটিন বদলি?
রংপুরের ঘটনাটি কেবল একটি জেলার প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি বৃহত্তর নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে অভিযোগ-ভোট কারচুপি, প্রশাসনিক পক্ষপাত, গণনায় অসঙ্গতি; অন্যদিকে তদন্ত ছাড়াই কর্মকর্তার প্রত্যাহার-এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এখন মূল প্রশ্ন হলো-নির্বাচন কমিশন কি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে? নাকি বিষয়টি প্রশাসনিক বদলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিতার বিকল্প নেই-এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।