ক্রুড অয়েল সংকট
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৬ পিএম
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৭ পিএম
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। ছবি: ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
ক্রুড অয়েল সংকটে অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়াত্ত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিতে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মার্চ মাসে দেশে কোনো ক্রুড অয়েল আমদানি না হওয়ায় এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগির ক্রুড অয়েল সরবরাহ করা না হলে আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বন্ধ হয়ে যেতে পারে তেল পরিশোধন কার্যক্রম।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাতকে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে অপারেশন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিগগির ক্রুড অয়েল সরবরাহ না পেলে আগামী সপ্তাহে বন্ধ হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটির তেল পরিশোধন কার্যক্রম।
যদি ক্রুড অয়েল সংকটে আগামী সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি হবে ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পর প্রথম ঘটনা। ১৯৬৭ সালে স্থাপন করা ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এই হিসাবে কোনো বছর এর সক্ষমতার কাছাকাছি, আবার কোনো বছর সক্ষমতার বেশি ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয় প্রতিষ্ঠানটিতে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটিতে আমদানি করা ৭ লাখ ৮ হাজার ৮১০ টন মারবান ক্রুড অয়েল, ৮ লাখ ৫ হাজার ২৮৪ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল, স্থানীয়ভাবে গ্যাস ফিল্ড থেকে পাওয়া ৫৯৭ টন কনডেনসেট এবং প্রারম্ভিক মজুদের ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৫৫ টনসহ সর্বমোট ১৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৪৬ টন ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণের জন্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ওই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিটে (সিডিইউ) ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। ওই বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিটে ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণ করা হয় ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৬১ টন। অর্থাৎ রিফাইনারি চালু রাখতে হলে প্রতি মাসে এক লাখ টনের বেশি ক্রুড অয়েল প্রয়োজন। মাসিক এই চাহিদাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রতি মাসে এক থেকে দেড় লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে। মাসে এর চেয়ে বেশি আমদানি করার সুযোগও খুব একটা নেই। কারণ ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) মজুদের সক্ষমতা রয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার টন।
বিপিসি’র আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিবহনের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্রাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গড়ে প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে বিপিসি। প্রতি মাসে দুটি জাহাজে করে এই তেল আনা হয়। এর মধ্যে একটি জাহাজ আসত মাসের শুরুর দিকে, অন্য জাহাজটি ক্রুড অয়েল নিয়ে আসত মাসের মাঝামাঝিতে। সেই অনুযায়ী চলতি মার্চ মাসেও ক্রুড অয়েল নিয়ে দুটি জাহাজ আসার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি জাহাজ ৪ মার্চ সৌদি আরব থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে আসার কথা ছিল। এরপর ২০ মার্চ অপর জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ দুটি আসতে পারেনি।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, আমদানি করা ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে সর্বশেষ জাহাজ আসে ১৮ ফেব্রুয়ারি। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ওমেরা গ্যালাক্সি ওই দিন চট্টগ্রাম বন্দরের কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে এসে পৌঁছে। এরপর এই পর্যন্ত ক্রুড অয়েল নিয়ে আর কোনো জাহাজ চট্টগ্রামে আসেনি।
সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারি আমদানি করা ক্রুড অয়েল দিয়ে স্বল্প পরিসরে গত এক মাস ধরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও এখন আর সেটি সম্ভব হচ্ছে না। পরিশোধনাগারটিতে এখন যেই পরিমাণ ক্রুড অয়েল আছে তাতে আর চার থেকে পাঁচ দিন পরিশোধনাগার চালু রাখা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
আর কতদিন পরিশোধনাগারটি চালু রাখা যাবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিশোধনাগারের অপারেশন্স কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখন পর্যন্ত পরিশোধনাগার চালু আছে। তবে এখন যেই পরিমাণ ক্রুড অয়েল আছে, তাতে ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল না এলে রিফাইনারির অপারেশন্স কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারির দৈনিক ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা ৪ হাজার ১০০ থেকে ২০০ মেট্রিক টন। এই হিসাবে ১৮ ফেব্রুয়ারি ওমেরা গ্যালাক্সি জাহাজে করে আমদানি করা ৯৯ হাজার ৬৪৬ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে সময় লাগবে ২৪ দিন। অথচ এখন পর্যন্ত ক্রুড অয়েল আমদানি বন্ধ আছে ৪১ দিন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ক্রুড অয়েল আসার আগে রিজার্ভারে আমদানি করা কিছু ক্রুড অয়েল ছিল। যে কারণে এখনও পরিশোধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ক্রুড অয়েল আমদানি বন্ধ হয়ে গেলেও এলপিজি, এলএনজি, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল নিয়ে একের পর এক জাহাজ আসছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে এই পর্যন্ত ৩৬টি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এর মধ্যে ৮টি জাহাজে এলএনজি, ১১টিতে এলপিজি, ৫টিতে হাই সালপার ফুয়েল, ৮টিতে গ্যাস ডিজেল, ২টি বেস অয়েল, একটিতে কনডেনসেট এবং বাকি একটিতে এমইজি আমদানি করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে তিনটি জাহাজ। তিনটি জাহাজের মধ্যে পিভিটি সোলানা নামের একটি জাহাজে করে মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে। বাকি দুটি জাহাজের মধ্যে গ্যাস চ্যালেঞ্জার নামের একটি জাহাজে করে ভারত এবং পল নামের আরেকটি জাহাজে করে মালদ্বীপ থেকে এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
এদিকে আরও কয়েকটি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে আসার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা। প্রতিদিনের বাংলাদশেকে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক দেশে তেল রেশনিং করে সরবরাহ করছে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ করে যাচ্ছি। বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে তেল কেনা হচ্ছে। মার্চ মাসে জ্বালানি নিয়ে অনেক জাহাজ এসেছে। এই ধারা এপ্রিল মাসেও যাতে অব্যাহত থাকে আমরা সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড অয়েল আমদানিরও চেষ্টা চলছে।