ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০০:২১ এএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-সংকট কাটিয়ে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটছে সরকার। উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবÑ এই চার স্তরে পদোন্নতির উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে নতুন গতি সঞ্চারের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এতে দীর্ঘদিন ধরে ‘বঞ্চিত’ হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মঙ্গলবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, পদোন্নতির লক্ষ্যে প্রশাসন ক্যাডারের নির্ধারিত ব্যাচের পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডারের সিনিয়র স্কেলে কর্মরত কর্মকর্তারাও আবেদন করতে পারবেন। উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২০০২ সালের বিধিমালার আলোকে এ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর জারি করা একটি পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক বাস্তবতা
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলে পদোন্নতি ও পদায়নে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও হবে দ্রুততর।
‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা
ওই প্রজ্ঞাপন ঘিরে সবচেয়ে বেশি আশাবাদ তৈরি হয়েছে ‘বঞ্চিত’ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে। এদের অনেকেই দীর্ঘদিন পদোন্নতির বাইরে ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিবÑ এভাবে ধাপে ধাপে দ্রুত পদোন্নতির একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা ইতোমধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত হয়েছেন, কিন্তু চাকরির মেয়াদ শেষের দিকে, তাদের গ্রেড-১ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এতে আর্থিক ও মর্যাদাগত উভয় সুবিধা বাড়বে।
ডিসি নিয়োগে নতুন তালিকা
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগেও আসছে পরিবর্তন। নতুন করে ‘ফিট লিস্ট’ তৈরি করে সেখান থেকে ডিসি নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মাঠ প্রশাসনে নতুন নেতৃত্ব আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হতে পারে একযোগে পদোন্নতি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের একযোগে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-২৫ ক্যাডারের উপসচিবরা, প্রশাসনের ২২তম ব্যাচের ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তারা ও ২৪তম ব্যাচের নিয়মিত কর্মকর্তারা। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে প্রশাসনে দীর্ঘদিনের জট একসঙ্গে কাটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতের প্রেক্ষাপট
গত বছরও বড় পরিসরে পদোন্নতির নজির দেখা গেছে। তখন উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বিভিন্ন পদে মোট ৭৬৪ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১৯ জন সচিব পদে উন্নীত হন। যদিও সেই উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কও ছিল, কারণ অনেকেই সেটিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছিলেন।
সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রশাসনকে গতিশীল ও কার্যকর করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের যথাযথ জায়গায় বসানো গেলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়, তা কমে আসবে। এছাড়া নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণÑ এমন উপলব্ধি থেকেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ে বার্তা
সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপÑ যেমন প্রটোকল কমানো, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরাসরি তদারকিÑ এসবকেও একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সরকারি কাজে গতি এসেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি ও সক্রিয়তা মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি বার্তা তৈরি করেছে; দায়িত্ব পালনে গাফিলতির সুযোগ কমছে।
জনপ্রশাসন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি সরকারের শুরুর সময়কার পদক্ষেপ ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দেয়। তবে মাত্র এক-দেড় মাসের কার্যক্রম দিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কঠিন।
তাদের মতে, এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে হয়, তাহলে তা প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু যদি আবারও রাজনৈতিক প্রভাব প্রাধান্য পায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নজর থাকবে পদোন্নতির তালিকা কতটা স্বচ্ছ হয়Ñ সেদিকে। বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায় কি না। মাঠ প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রভাব কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়। সব মিলিয়ে জনপ্রশাসনে এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের জন্য এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, তেমনি সরকারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র; প্রশাসনিক সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়Ñ সেটিই এখন দেখার বিষয়।