বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৯:৫৩ পিএম
রোহিঙ্গা শিবির। ছবি : ইউনিসেফ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না বলে সংসদকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তবে সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা ও আইনি লড়াই জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় সংসদে সোমবার চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, “এখন পর্যন্ত ৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে”।
তিনি জানান, ১৯৭৮ সালে যখন মিয়ানমার থেকে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আগমন ঘটে, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় তাদের সবাইকে সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়। এরপর ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফল নেতৃত্বে আরও প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন, “মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা— বিশেষত সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত সত্ত্বেও পূর্বের এই অভিজ্ঞতার আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে”।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের ইভেন্ট আয়োজন করা হয়। সেখানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া, গত ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে কক্সবাজারে একটি অংশীজন সংলাপ আয়োজন করা হয়, যেখানে ঢাকাস্থ কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘ সংস্থা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
আইনি লড়াই ও আইসিজে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা অপরাধের দায়ে নেদারল্যান্ডের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) বিচারাধীন ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাটি বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান তিনি। ড. খলিলুর রহমান জানান, গত ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মামলাটির মেরিট ফেইজ (Merit Phase) এর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলার আইনি ব্যয় নির্বাহে গাম্বিয়াকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।
তথ্য যাচাইকরণের বর্তমান অবস্থা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সাথে তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংসদকে জানানো তথ্যানুযায়ী, মোট ৬টি ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন। এর মধ্যে যাচাই সম্পন্ন হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জন (জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) এবং ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মিয়ানমার তাদের ‘সাবেক বাসিন্দা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া ওআইসির পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুটি আলাদা রেজুলুশন গৃহীত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট অবস্থান— নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র সমাধান বলে জানান তিনি।