দীপক দেব
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ১১:০৮ এএম
দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত এক বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ফলে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার কথা ভাবছে সরকার। বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে চলছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে জরুরি বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভর্তুকি কতটা কমবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ ২৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকট ও ইরান যুদ্ধের ফলে এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনায় ভর্তুকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি লাখ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ ও আসন্ন আইএমএফ বৈঠক সামনে রেখে সরকারের সামনে ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সরকার এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। গ্রাহকস্বার্থ ও অর্থনৈতিক চাপÑ দুই দিক বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অন্তত এক বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করার একটা পরিকল্পনা নতুন সরকারের ছিল। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে পড়তে শুরু করেছে। আমদানিনির্ভর এই খাতের পেছনে সরকারকে বাড়াতি গুনতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ভর্তুকি। এ অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরকারকে আরও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হতো, সেটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার এখন স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি আমদানি করছে। কিন্তু এই দ্বিগুণ দামে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই সরকারের কাছে। ফলে বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে বছরে ভর্তুকির পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বিদ্যুতের ভর্তুকি কমাতে অনেক দিন ধরেই চাপ দিচ্ছে দাতা সংস্থাগুলো। এই অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বা কমানোর বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত। আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবেÑ সেভাবে কাজ করব। যুদ্ধকালীন কয়লাভিত্তিক সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে চালানোর একটি পরিকল্পনা হয়েছে।’
এদিকে দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গতকাল শনিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। যতটুকু জানি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎমন্ত্রী মূল্য বৃদ্ধি করা হবে নাÑ এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা সেই বিষয় পর্যন্তই জানি। মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’
প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রায় নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানুষ অতিষ্ঠ ছিল।’ সেই বিষয়টি বিবেচনায় তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করতে। তবে সেই বৈঠকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক দুরবস্থার বিষয় তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে গত অর্থবছরেও প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। চলমান অর্থবছরে অনেক দেনা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় বিপিডিবি এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ভর্তুকি বা লোকসান কমিয়ে আনতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
ভাবাচ্ছে বিপুল অঙ্কের বকেয়া : রমজান ও ঈদের সময় বড় ধরনের সমস্যা ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে চলতি সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও সমাধানে বেগ পেতে হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন ছিল প্রায় সমান সমান। পাওয়ার গ্রিডের হিসাব অনুযায়ী যা ছিল ১২ হাজার ৯৯৩ মেগাওয়াট। তবে এই চাহিদা ১৮ হাজার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে বিপুল অঙ্কের বকেয়া নিয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে সরকার। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিসাবে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে তাদের। সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হতে পারে এবং গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
বিআইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে থাকা মজুদ জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে মজুদের অসম বণ্টনের কারণে কিছু এলাকায় এর আগেই সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৫-৪৯ শতাংশই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। ফলে সময়মতো বিল পরিশোধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।’
বিকল্প জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর : অন্যদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। আর দীর্ঘ সময় ধরে দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে দেশের মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বাড়ে, যা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি বা তার বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।’ তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হলে শিল্প খাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই অবস্থায় সংকট মোকাবিলায় এখনই বিকল্প জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।