কবির হোসেন
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ১১:০১ এএম
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদ। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে সম্প্রতি পৃথক মামলায় গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাছে পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। মাসুদ উদ্দিনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে মানব পাচার মামলায়। আর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুনকে নেওয়া হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলায়।
গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলা সংশ্লিষ্ট ও এক-এগারোর সরকার এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলের অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সূত্র আরও জানিয়েছে, রিমান্ডে তাদের অপকর্মের আশানুরূপ তথ্য না পাওয়া গেলে প্রয়োজনে গভীর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করবে ডিবি।
এক-এগারো এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে গুম-খুনের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন শেখ মামুন খালেদ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডিজিএফআইর পরিচালক (এফএসআইবি ও সিআইবি) থাকাকালে তার বিরুদ্ধে অনেক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইর মহাপরিচালক ছিলেন মামুন খালেদ। আওয়ামী লীগের আমলে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ নানা অপকর্মের অন্যতম ক্রীড়নক ছিলেন এই মামুন খালেদ। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গড়ে তোলা জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামুন খালেদের আর্থিক দুর্নীতি অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২২ মে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। অবশেষে বিতর্কিত এই সেনা কর্মকর্তাকে গত বুধবার রাতে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন ডিওএইচএসের ১০৭৯ নম্বর বাসার ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গত বৃহস্পতিবার আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে গ্রেপ্তার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালের ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর সময় প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে, যা ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত। এই সময় ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠন, জরুরি অবস্থা জারি এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের মতো ঘটনাগুলো দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়টিতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রের একজন কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হন। উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে তার ভূমিকার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক তাকে সেই সময়ের বাস্তবায়নকারী বা ‘ফিল্ড অপারেটর’ হিসেবেও দেখেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে নির্যাতনের নির্দেশদাতা হিসেবে তার নাম বহুল আলোচিত।
ওয়ান-ইলেভেনপরবর্তী সময়ে তার ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ২০০৮ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। জাতীয় পার্টির মনোনয়নে তিনি ফেনী-৩ আসন থেকে দুই দফা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর মানব পাচারসহ তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফেনী ও ঢাকায় মোট ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কয়েকটি মামলার বিচার চলমান।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মাসুদ উদ্দিন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান কানাডায়। সেখানেও তিনি ব্যবসা শুরু করেন। কানাডা থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ১১ মামলা মাথায় নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি দেশে ফেরেন। পরপরই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তার পিছু নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পারিবারিকভাবে যোগাযোগ শুরু করেন। সূত্র আরও জানায়, একইভাবে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদও গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। তিনিও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
ডিবির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে ডিবির। রিমান্ডে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক-এগারোর সরকার এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলের অনেক অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা তারা যেসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই মামলা সংক্রান্ত্র বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আলোচিত অন্য বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখছি, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্য পেয়েছি সেগুলো সন্তোষজনক নয়। যদি প্রয়োজন হয় গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে আবারও রিমান্ডের আবেদন করতে পারি।