× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

৫৮ দিন বন্ধ থাকবে সামুদ্রিক মাছ ধরা কার্যক্রম

দীপক দেব

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬ ২২:২৭ পিএম

মাছ ধরা ট্রলার। প্রতিকী ছবি/ ইউএনবি

মাছ ধরা ট্রলার। প্রতিকী ছবি/ ইউএনবি

বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মোট ৫৮ দিন সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই সময়ে দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় দেশি-বিদেশি কোনো ট্রলার বা নৌযান মাছ আহরণ করতে পারবে না। বিশেষ করে বিদেশি ট্রলারের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সমুদ্রে কড়া নজরদারি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় স্বরাষ্ট্র, নৌপরিবহন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রে মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখলে সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি বিদেশি ট্রলার দ্বারা অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা গেলে দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। এই সময় কোনো ট্রলার বা মাছ ধরার নৌযান সমুদ্রে যেতে পারবে না। এই সময়টি অধিকাংশ সামুদ্রিক মাছের প্রজনন মৌসুম। ফলে এ সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হলে মাছের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। 

বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমা মূলত বঙ্গোপসাগর এলাকায় বিস্তৃত। এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক মাছের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায় বলে সভায় মৎস্য অধিদপ্তরের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়। তথ্য মতে, গত এক দশকে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অতীতের নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক ফল

সরকারিভাবে ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ রাখার কর্মসূচি চালু রয়েছে। শুরুতে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরে তা সংশোধন করে ৫৮ দিনে নির্ধারণ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা চালুর আগে দেশের সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ টনের কাছাকাছি। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ টনেরও বেশি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৃদ্ধি সরাসরি প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের ফল। এতে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং সমুদ্রের মাছের মজুদ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। নিয়মিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিদেশি ট্রলারের অবৈধ মাছ শিকারই বড় হুমকি

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশের জলসীমায় বিদেশি ট্রলার দ্বারা অবৈধ মাছ শিকারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বিদেশি ট্রলার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ঢুকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মাছ আহরণ করে থাকে। এই অবৈধ মাছ শিকার দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। কারণ এসব ট্রলার বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করে নিয়ে যায়, যা দেশের জেলেরা ধরতে পারে না।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমুদ্রে নজরদারি বাড়াতে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে টহল জোরদার করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।

জেলেদের জীবিকা সংকট ও সরকারের সহায়তা

সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে জেলেদের জীবিকা সাময়িকভাবে সংকটে পড়ে। এই সময় তাদের আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যায়। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিবন্ধিত জেলেদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু থাকবে। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের মাঝে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণ করা হবে। অধিকাংশ জেলে এই নিষেধাজ্ঞাকে প্রয়োজনীয় মনে করলেও তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খুলনার কয়রা উপজেলার এক জেলে বলেন, সমুদ্রে মাছ বাড়ানোর জন্য নিষেধাজ্ঞা দরকার, কিন্তু এই সময় তাদের পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে যায়। যদি সরকার আরও সহায়তা দেয় তাহলে তাদের পক্ষে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা সম্ভব।

সমুদ্র অর্থনীতি ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে সমুদ্র থেকে। মৎস্য খাত দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবিকা অনেকাংশে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ‘ব্লু ইকোনমি’ খাতে বাংলাদেশ বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের পরিকল্পনা

সভা সূত্র বলছে, সরকার সমুদ্রে নজরদারি বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ ট্র্যাকিং সিস্টেম, স্যাটেলাইট মনিটরিং এবং সমুদ্র টহল জোরদার করা। প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বিদেশি ট্রলার শনাক্ত করা সহজ হবে এবং অবৈধ মাছ শিকার দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সমুদ্র বিশাল হওয়ায় শুধু টহল দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। উপকূলীয় জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি), বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রমও জোরদার করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জেলেদের সহযোগিতা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন।

টেকসই সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনার পথে

সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধের ৫৮ দিনের এই সিদ্ধান্তকে সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি শুধু মাছের উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও রক্ষা করবে। তবে এজন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, বিদেশি ট্রলারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে এবং ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা