হোসেন শহীদ মজনু
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৯ এএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১১:২০ এএম
খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত গণহত্যা জাদুঘর।
দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছরেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা চালানোর ঘটনার বিশ্ব স্বীকৃতি মেলেনি। এ বিষয়ে সরকারিভাবে খুব একটা তোড়জোড়ও দেখা যায়নি। বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য এটি বড়ই বেদনা ও দুঃখের। তবে বিশ্ব স্বীকৃতির দাবি জোরালো করতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখন। কথাগুলো বলছিলেন খুলনায় অবস্থিত গণহত্যা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব ড. বাহারুল আলম।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এর এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব একান্ত আলাপে আরও বলেন, এটি দেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা খুলনার চুকনগরে ১৯৭১ সালে সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল। এ ছাড়া গল্লামারী বধ্যভূমি খুলনা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও নৃশংসতম ঘটনার সাক্ষী। এসব কারণে এ জাদুঘর খুলনায় স্থাপন করা হয়েছে। তবে শুধু খুলনা নয়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশে গণহত্যার যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে, সেগুলোর জায়গা হয়েছে এ জাদুঘরে। যদিও দেড় বছরের অধিক সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এ গণহত্যা জাদুঘরটি।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের উৎসাহে ২০১৪ সালের ১৭ মে এ গণহত্যা জাদুঘরের যাত্রা শুরু। প্রথমদিকে ময়লাপোতা এলাকার শেরেবাংলা রোডে ভাড়া বাড়িতে শুরু হয় এ জাদুঘরের কার্যক্রম। ২০১৫ সালের আগস্টে নগরীর ২৬, সাউথ সেন্ট্রাল রোডের দ্বিতল একটি বাড়ি বরাদ্দ পায় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ এ বাড়িতে স্থানান্তরের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শুরু হয় জাদুঘরের কর্মকাণ্ড। এখানে সংরক্ষিত আছে ১৯৭১ সালের গণহত্যা-নির্যাতনের নিদর্শন, বাঙালির মুক্তি, স্বাধীনতার স্পৃহা আর মুক্তিযুদ্ধকালের সবচেয়ে মর্মন্তুদ পর্বের অসংখ্য নিদর্শনÑ বধ্যভূমি, গণকবর। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের যন্ত্রণাকাতর দিনগুলো পলকেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এ জাদুঘরে গেলে।
গণহত্যা জাদুঘরে প্রবেশের পর প্রথম গ্যালারি যেকোনো দর্শনার্থীর চোখ আটকে যাবে কাচঘেরা কয়েকটি বাক্সে। সেখানেই ১৯৭১ সালের অস্থির একটা সময়ের খণ্ডচিত্র সুরক্ষিত আছে। স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে লেখা তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ চিঠি। বিশেষ এ কারণে যে, ওই সময়ের জনপ্রিয় বক মার্কা সিগারেটের প্যাকেটের পাশে দুই লাইনের একটি চিঠি। যেখানে লেখা ‘জোহরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে মিশে যেয়ো। ঐ মতো ব্যবস্থা (দুই)।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত এই জাদুঘর তাদের প্রশিক্ষিত গবেষকদের মাধ্যমে দেশের ৪২টি জেলার গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের তথ্য পেয়েছে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও এ দেশীয় দোসরদের মাধ্যমে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে ১৮ হাজার ৪৮১টি। এসব জেলায় বধ্যভূমি শনাক্ত হয়েছে ৮৮৮টি; গণকবর ১ হাজার ৩১৩টি ও নির্যাতনকেন্দ্র শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৭৪টি।
দেশের সব গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবরকে চিহ্নিত করে, সেসব স্থানের জিপিএস লোকেশন নিয়ে ডিজিটাল ম্যাপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল জাদুঘরের গবেষণাকেন্দ্র। এ ছাড়া তারা সারা দেশের বধ্যভূমির মানচিত্র করবে। এরই মধ্যে ৩৪টি জেলার ডিজিটাল ম্যাপ ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।
‘গণহত্যা নির্ঘণ্ট সিরিজ’ নামে বইও প্রকাশ করেছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত ১২৬টি গণহত্যার ওপর আলাদা করে বই প্রকাশ করেছে তারা। এ ছাড়া জাদুঘরে ৫ হাজারের বেশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই আছে। গণহত্যা ও নির্যাতনের ওপর বাঁধানো ছবির সংখ্যা ১৫৫টি। ‘শিল্পীর চোখে গণহত্যা-নির্যাতন আর্ট’ শিরোনামে ছবি আছে ১২টি। ২০১৫ সালে ‘শিল্পীর চোখে গণহত্যা নির্যাতন’ নামে আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়, সেখানকার ১৭টি ছবি আছে। আছে প্রামাণ্যচিত্রের সিডিসহ মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার অনেক নিদর্শন।
ড. বাহারুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অসংখ্য গণহত্যা, নির্যাতনের স্থান হারিয়ে গেছে, কোথাও রাস্তা হয়েছে, কোথা ভবন উঠেছে। এমনকি কোথাও স্কুলও গড়ে উঠেছে। আমরা জাদুঘরের পক্ষ থেকে যেসব স্থান চিহ্নিত করতে পেরেছি, সেখানে স্মৃতিফলক বসিয়ে দিয়েছি। যতটা তথ্য পাওয়া গেছে, উদ্ধার করে সেইসব তথ্য, নাম-ঠিকানা স্মৃতিফলকে লিখে দিয়েছি। এই কার্যক্রমকে একটু সুশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন ছবি, তথ্য আমরা সংরক্ষণের জন্য চিন্তাভাবনা করছি, সেগুলো সংরক্ষণ করতেও সময় গেছে। যখন আমাদের জাদুঘরটি উদ্বোধন হবে হবে, এই সময় জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হলো এবং ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি জাদুঘরকেও কোনোভাবে নিষ্কৃতি দেয়নি। হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা শক্তি অহেতুক জাদুঘরের ওপরে হামলে পড়েছে। জাদুঘর ভাঙচুর করতে চেয়েছে। আমাদের কর্মকর্তারা সবাই এখন পলাতক। জাদুঘরে মূলত একজন দারোয়ান ছাড়া আর কেউ নেই এখন। আমরা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছি, এটি একটি জাতীয় সম্পদ। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি প্রথম গণহত্যা জাদুঘরের একটি আর্কাইভ। জার্মানির হলোকাস্টের পরে আমরা মনে করি এটি আরেকটি গণহত্যা জাদুঘর হবে। আমাদের গণহত্যাটি এখনও বিশ্ব স্বীকৃত না। ইউনেস্কো এ বিষয়ে তদন্ত করেছে, এই জাদুঘরে তারা একবার এসেছিল। তারপরই তো কার্যক্রমটা স্তব্ধ হয়ে গেল। এখন এটাকে পুনর্জীবিত করতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। সেটা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করুক, সেটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় করুক বা জাতীয় জাদুঘর করুক। আহ্বান জানাব খুলনার মেয়রের কাছেও।’
২০২৪ সালের মধ্যেই দেশের সব জেলার গণহত্যা জরিপের ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন গণহত্যা জাদুঘরের উদ্যোক্তারা। বাকি ২২ জেলার মাঠ পর্যায়ের কাজ তখন প্রায় শেষ, যাচাই-বাছাইসহ তথ্য সংযোজন-বিয়োজনের কাজ চলছিল। কিন্তু কঠিন এক বাস্তবতা এ মহতী উদ্যোগকে থমকে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা গোষ্ঠী বাইরে থেকে জাদুঘরে আঘাত করেছে, ইটপাটকেল ছুঁড়েছে। বড় ধরনের কোনো ক্যাজুয়ালটি হয়নি। ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই ভয়ে পালিয়ে গেছেন। তারা এখনও ফেরেননি, একমাত্র দারোয়ান রয়েছেন। জাদুঘরটি বন্ধ। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় জাদুঘর এটি দেখভাল করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে জাতীয় জাদুঘর তদারকি করে। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পরে থেকে সবকিছু থমকে আছে, অর্থায়ন বন্ধ।
গণহত্যা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব ড. বাহারুল আলম বলেন, আমরা মনে করি বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। তাদের উচিত হবে অচিরেই এ জাদুঘর খুলে দেওয়া, নতুন প্রজন্মের বিশেষ করে ছাত্র-যুবক-শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিনিয়ত দেখতে পারে, শুনতে পারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ইতিহাস।
গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব
এদিকে গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান গত ২০ মার্চ প্রতিনিধি পরিষদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে প্রস্তাবটি। এতে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। সে সময় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা ব্যর্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে এবং ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে ব্যাপকহারে নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তার পাঠানো বার্তায় ঘটনাগুলোকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত এক বার্তায় তিনি এবং দেশটির কূটনীতিকদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতার প্রতিবাদ জানান। সেখানে বলা হয়, এই সংঘাতে ‘গণহত্যা’ শব্দটি প্রযোজ্য।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সামাজিক কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।