× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি তেলের সংকটে সারা দেশে হাহাকার

রাহাত হুসাইন, ঢাকা ও হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম থেকে

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪০ এএম

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:০০ এএম

তেলের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্পের সামনে আসতেই তেল ফুরিয়ে যায়। ফলে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। তেজগাঁও ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবার বিকালের দৃশ্য। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

তেলের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্পের সামনে আসতেই তেল ফুরিয়ে যায়। ফলে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। তেজগাঁও ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবার বিকালের দৃশ্য। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে সারা দেশের মানুষ যখন কর্মক্ষেত্রে ফিরছে, তখন তাদের ফিরতি যাত্রার চাকা থমকে পড়েছে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদÑ সবখানেই জ্বালানি তেল এখন যেন দুষ্প্রাপ্য ‘সোনার হরিণ’। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার দাবি করা হলেও পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার চলছে। সরকারি বয়ান ও মাঠের বাস্তবতার চরম বৈপরীত্যের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষ হচ্ছে চিড়াচ্যাপ্টা।

অন্যদিকে দেশে হঠাৎ করেই জেট ফুয়েলের দাম লিটারে এক লাফে ৯০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন এ দাম কার্যকর হবে বুধবার থেকে। খাতসংশ্লিষ্টরা এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক’বলছেন। তারা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। মূল্যবৃদ্ধির ফলে এয়ারলাইনস, ট্রাভেল এজেন্সি এবং যাত্রী- সব পক্ষই বড় ধরনের চাপে পড়বে।

সংকটের আশঙ্কায় মজুদের প্রবণতা

গতকাল ঈদ-পরবর্তী প্রথম কর্মদিবসে সকাল থেকেই বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। যদিও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি ছিল না কোনো স্টেশনে। ডিপো থেকে তেল আসার নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। একের পর এক পাম্প ঘুরে হতাশ হয়ে চালকদের ফিরে যেতে দেখা গেছে। অধিকাংশ জায়গায় ঝুলতে দেখা গেছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন থেকে মাইকিং করে বলতে দেখা গেছে, পেট্রোল-অকটেন নেই। অথচ অভিযোগ, এরই সমান্তরালে খোলা বাজারে চড়া দামে ভেজাল জ্বালানি বিক্রির মহোৎসব চলেছে।

সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তেল মজুদের প্রবণতাও বাড়ছে। অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে চাইছেন, যা লাইনের দৈর্ঘ্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সরবরাহে সাময়িক চাপ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি বাস্তবের চেয়ে আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।

এদিকে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। পেট্রোল পাম্পে অযথা লাইন দীর্ঘ না করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে এবং সরবরাহও কমানো হয়নি। তাই পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।’ তিনি বলেন, “প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতাই পরিস্থিতিকে জটিল করছে। এতে ভিড় বাড়ছে, লাইন দীর্ঘ হচ্ছে।”

এই পরিস্থিতির জন্য ব্যাংক বন্ধ থাকাকে দায়ী করেছেন পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মালিকরা পে-অর্ডার করতে পারেননি, ফলে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন সম্ভব হয়নি।’

তেলের দাম বাড়তে পারে দেশে

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পাম্প মালিক জানিয়েছেন, মজুদ থাকার পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে সরবরাহ কম আসছে। তারা ধারণা করছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামনে রেখে আগামী ১ এপ্রিল থেকে তেলের দাম বাড়ানো হতে পারে। এ সম্পর্কে চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস এজেন্সিস লিমিটেডের ম্যানেজার শওকত জাহান রোমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা চাহিদামতো তেল সরবরাহ পাচ্ছি না। আমাদের এখানে দৈনিক তেলের চাহিদা ৪ হাজার ৫০০ লিটার। সেখানে আমাদের সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ লিটার। যে কারণে আমরা ক্রেতাদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে পারছি না। বিকালের পর থেকে স্টেশনে ফিলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

বিপণন কোম্পানিগুলো সব ফিলিং স্টেশনেই চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “জ্বালানি তেল নিয়ে আশাহত হওয়ার কিছু নেই। আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। চলতি মাসের এই কয়েক দিনের মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে তিনটি জাহাজ আসবে। প্রতিটি জাহাজে ৩০ হাজার মেট্রিক টন করে ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে। এর বাইরে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসবে। ৩১ মার্চের মধ্যেই এসব জ্বালানি তেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছবে। তাই জ্বালানি তেল নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”

এপ্রিল মাসের জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দেশে যাতে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য আমরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনার চেষ্টা করছি। আশা করছি এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেল আমদানি স্বাভাবিক থাকবে। এপ্রিলে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনের ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে ৪ লাখ ২৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানি করা হবে।”

ভোগান্তি থেকে উত্তেজনা হয়ে সংঘাত

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মানুষ তেল পাচ্ছে নাÑ এমন দাবি করে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের সংগঠন হুইলার্স অ্যালায়েন্স ফর রোড সেফটির (ওয়ারস) মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর মো. সাহিদ আহমেদ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে তেল মজুদ থাকার কথা বললেও মাঠের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন নেই। অনেক পাম্প ২০০-৩০০ টাকার সীমিত তেল দিয়ে দায় সারছে। এতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে শুধু তেলের অপেক্ষায়। ঈদের মতো উৎসবেও মানুষকে পরিবার ছেড়ে থাকতে হচ্ছে পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকতে।’

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। মাদারীপুরের শিবচরে পেট্রোল মজুদ করে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে এক দোকান মালিককে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে প্রায় ১০০ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়, যা পরে ন্যায্যমূল্যে স্থানীয়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় পেট্রোল ও অকটেনের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সীমিত সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে তেল না পেয়ে যানবাহন ব্যবহার করতে পারছেন না। খোলা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি, পরিমাণে কম দেওয়া ও ভেজালের অভিযোগও উঠছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে উত্তেজনাও তৈরি হচ্ছে।

রাজবাড়ীর কালুখালীতে তেল নেওয়ার সিরিয়ালকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। নেত্রকোণা ও খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায়ও জ্বালানি সংকটের খবর পাওয়া গেছে।

সংকটের এই প্রেক্ষাপটে সরকার বিকল্প উৎস খোঁজার কথা বলছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপের কথা স্বীকার করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। তা মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি করার বিষয়ে বাংলাদেশ যে আগ্রহ দেখিয়েছিল, সে বিষয়ে গ্রিন সিগন্যাল মিলেছে।”

জেট ফুয়েলের দামে বড় ধাক্কা

এদিকে বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ৯০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন দাম আজ বুধবার থেকে কার্যকর হবে। খাতসংশ্লিষ্টরা এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার তেলের দাম বাড়াতে জুম অ্যাপে জরুরি সভা করে বিইআরসি। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে এক লাফে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা বা ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ফুয়েলের দাম ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। দর বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৯ শতাংশ।

এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এর ফলে গুরুতর পরিচালনাগত প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “এই অবস্থা চলতে থাকলে এয়ারলাইনস ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ দেশে এসেছে। এসব তেল পূর্বনির্ধারিত মূল্যে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্প্রতি তেলের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে ভিত্তি করে এত বড় পরিসরে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আমরা ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের ভিন্নমত নোট জমা দিয়েছি।”

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা