মাসুদ রানা
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১০:১১ এএম
ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের কৌশলে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা করা হয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণে ৩১৫ জন নিহত হয়। সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ‘কারফিউ’ ও ‘সান্ধ্য আইন’ জারি করে। বাঙালির আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে সামরিক প্রস্তুতি নিতে থাকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের কৌশলে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা করা হয়।
এই খবর বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ১৯ মার্চ জয়দেবপুর ও আশপাশের এলাকা এবং টঙ্গীর জনগণ ও শ্রমিকদের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জনগণ ঢাকা-চৌরাস্তা-জয়দেবপুর সড়কের টঙ্গী, চৌরাস্তা, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ইট, গাছের গুঁড়ি ও ঠেলাগাড়ি দিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ব্যারিকেড তৈরি করে। জয়দেবপুরে গুলিবর্ষণে মনু খলিফা ও কিশোর নেয়ামত নিহত হন। আহত হন ডা. ইউসুফ, সন্তোষ কুমার মল্লিক, শাহজাহানসহ আরও অনেকেই। এ ঘটনার পর সারা দেশে স্লোগান উঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’; ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু কর’।
মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে সকাল থেকেই মানুষ হাতে আড়াই হাত লম্বা লাঠি, রামদা, কার্তুজ-বন্দুক, হকিস্টিক, তীর-ধনুক ও বল্লম নিয়ে জয়দেবপুর বাজারের বটতলায় জড়ো হতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া থেকে বাধা দিতে সেখানে জনতার ঢল নামে। মুক্তিসংগ্রাম কমিটির নেতারা উপস্থিত হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়।
পাকিস্তানি সেনাদের ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে জনতা বাজারের বটতলা সংলগ্ন রেলক্রসিং গেটে একটি মালগাড়ির বগি ঠেলে এনে ব্যারিকেড তৈরি করে এবং রেললাইনের নিচ থেকে কাঠের স্লিপার খুলে ফেলে। সেদিন স্বাধীনতার দাবিতে নানা স্লোগানে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।
এ সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের কাছ থেকে চারটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি এসএমজি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং পাঁচজন সেনাকে আটক করা হয়। তবে ড্রাইভারসহ আরও একজন সৈন্য পালিয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ঘটনাটি জানালে ব্রিগেডিয়ার জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। মেজর মঈনের ইঙ্গিতে সেনারা প্রথমে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। মুহূর্তের মধ্যে গুলির আঘাতে দেবদারু গাছের ডালপালা ঝরে পড়তে থাকে এবং পাকিস্তানি সেনারা শিলাবৃষ্টির মতো গুলি চালাতে থাকে। এতে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
কারফিউ জারি হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স জয়দেবপুরে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ঢাকায় আনতে গিয়ে ফিরে আসে।
জয়দেবপুর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “ইহাই কি তবে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া লওয়ার নমুনা? তাহলে সৈন্যদল কি করিয়া জয়দেবপুর বাজারে গেল?” তিনি এই ঘটনাকে উস্কানিমূলক আখ্যায়িত করে বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ সমস্যা সমাধানের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তার অর্থ এই নয় যে, তারা শক্তি প্রয়োগে ভয় পায়। জনগণ যখন রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়; তখন দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাহাদিগকে পরাভূত করিতে পারে না।”
স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে জয়দেবপুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও নিহতদের প্রতি শোক জ্ঞাপন করে বলে, “জয়দেবপুরের বীর বাঙালিরা সেনাবাহিনীর গতিরোধ করিলে; সেনাবাহিনী জনতার প্রতি গুলিবর্ষণ করে। আমরা সেনাবাহিনীর এই কাজে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। আমরা ঘটনায় নিহত শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাহাদের শোকাহত পরিবারবর্গকে আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছি।”