বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ০০:৪৪ এএম
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩০ পিএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো: গ্রাফিক্স প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রশাসনের অন্দরমহলে দীর্ঘদিনের আলোচিত ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার একান্ত সচিব (পিএস) মো. আবুল হাসানকে অবশেষে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন এবং দ্রুত ভোল পাল্টে প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগের মুখে তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
প্রশাসনিক দাপট ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা
প্রশাসনিক সূত্রমতে, যুগ্মসচিব মো. আবুল হাসান পিএস হিসেবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পিএসদের সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ না থাকলেও, তিনি নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যান যেখানে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তার মতামতই চূড়ান্ত বলে গণ্য হতো। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার বিভাগে থাকাকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যে তার ‘অনানুষ্ঠানিক অনুমোদন’ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ত না বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তিনি এমন একটি বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে মন্ত্রণালয়ের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাও তার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না”।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কৌশলগত উত্থান
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দ্রুত নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন আবুল হাসান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদেশে কর্মরত থাকলেও সরকার পতনের পরপরই দেশে ফিরে তিনি নিজেকে ‘ছাত্র প্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তি’ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। একটি প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের আস্থাভাজন হয়ে উঠে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান।
প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় সরকার বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে। মন্ত্রণালয়ের ভেতরে একটি ‘অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো’ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, “প্রশাসনের স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড অনেকাংশেই ভেঙে পড়েছিল। ফাইল কোথায় যাবে, কে কোন পদে যাবে-এসব নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান”।
এছাড়া, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি ‘বিশেষ প্রভাব’ খাটাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও ওঠে।
পদোন্নতি ও ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বিতর্ক
পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই আবুল হাসান যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পান, যা নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে তিনি পরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি ‘প্রাইজ পোস্টিং’ নিশ্চিত করেন।
প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “সাধারণ নিয়মে এমন দ্রুত পদোন্নতি ও আকর্ষণীয় পোস্টিং পাওয়া কঠিন। এখানে স্পষ্টতই প্রভাব কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে”।
অতীত নিয়েও প্রশ্ন
আবুল হাসানের অতীত নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে ‘সুবিধাবাদী’ কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে কনস্যুলার পদে কর্মরত ছিলেন এবং নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন।
প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, তিনি সব সময়ই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার কৌশল জানতেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের অবস্থান বদলাতে পারতেন।
ওএসডি: শাস্তি নাকি কৌশল
অবশেষে তাকে ওএসডি করা হয়েছে—যা সাধারণত প্রশাসনে একটি ‘নিরপেক্ষ অবস্থান’ বা অনেক ক্ষেত্রে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ প্রশমনের একটি প্রচেষ্টা।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, “এটি একটি বার্তা-ক্ষমতার অপব্যবহার করলে শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি ভোগ করতে হয়”।
সূ্ত্র জানায়, এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতির প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল একজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একান্ত সচিবদের ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
একজন সাবেক সচিব বলেন, “প্রশাসনকে যদি পেশাদার রাখতে হয়, তাহলে ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে”।
মো. আবুল হাসানের উত্থান ও পতনের এই গল্প প্রশাসনের জন্য এক ধরনের ‘কেস স্টাডি’। এতে যেমন ব্যক্তিগত কৌশল ও ক্ষমতার ব্যবহার দেখা যায়, তেমনি প্রশাসনিক দুর্বলতার দিকগুলোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখন দেখার বিষয়, এই ওএসডি আদেশের পর প্রশাসনে সত্যিকারের কোনো পরিবর্তন আসে কি না-কি এটি কেবল সাময়িক আলোচনার বিষয় হয়েই থেকে যায়।