অমর একুশে বইমেলা
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১২:৫০ পিএম
দেশের প্রকাশকদের অতৃপ্তি ও অব্যক্ত হতাশায় নিমজ্জিত করে গতকাল রবিবার রাত ৯টায় অমর একুশে বইমেলার পর্দা নামল।
কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তন আর নানা নাটকীয়তার পরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর পর্দা নেমেছে। গতকাল রবিবার রাত ৯টায় দেশের প্রকাশকদের অতৃপ্তি ও অব্যক্ত হতাশায় নিমজ্জিত করে অমর একুশের চেতনায় অনিন্দ্য আগামীর প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে শেষ হলো দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসব। মাত্র ১৮ দিনের এই বইমেলা শেষের সঙ্গে সঙ্গে থামল প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সাময়িক ব্যস্ততা; এক বছরের জন্য থেমে গেল বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকাশক-লেখক-পাঠকদের পদচারণায় মুখর হওয়ার দিন।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে রবিবার অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
স্বাগত বক্তব্যে মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, “সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদযাপনে আগামীর বইমেলা নতুনরূপে প্রত্যাশা জাগাবে, আমরা এই আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।”
মফিদুর রহমান বলেন, “এবারের বইমেলা ছিল আগের মেলাগুলোর তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন। মেলায় প্রকৃত পাঠকদের উপস্থিতি ছিল বেশি। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য ভালো মানের বই এবং আনন্দদায়ক আয়োজনের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করার কথা আমাদেরকে ভাবতে হবে।”
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায়বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্রগঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।”
গুণিজন স্মৃতি পুরস্কার
গতকাল বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২৬, গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য, প্রথমা প্রকাশন এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিডেটকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, সর্বাধিক সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং মেলায় প্রথম অংশগ্রহণ করে গুণগতমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সহজ প্রকাশকে সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গলবুকসকে প্রদান করা হয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার।
যা বলছেন উদ্যোক্তা ও প্রকাশকরা
বইমেলা সম্পর্কে সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ বলেন, “এবারের মেলা যেন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার মেলা ছিল। যেমন আশঙ্কা করেছিলাম তাই সত্যি হলো। আশা করছি এবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের মেলার আয়োজন করা হবে।”
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম সাংবাদিকদের বলেন, “ভবিষ্যতের বইমেলার ধরন ও সময় নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা থাকবে প্রকাশকদেরই।”
প্রকাশকরা বলছেন, ২০২৫ সালে আতঙ্কের মধ্যে মেলা করতে হয়েছে। অনেক প্রকাশক মেলায় আসতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিব ইত্যাদি সংক্রান্ত বই প্রকাশ করার ‘অপরাধে’ একজন প্রকাশক ছিলেন জেলখানায়। ২০২৫ সালে এবং এবারও বাংলা একাডেমি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বই প্রদর্শন করেনি। এবারের বইমেলার প্রথমদিকেও প্রকাশকদের মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমান ইত্যাদি ধারার বই বিক্রি করতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে লেখালেখি ও সমালোচনা হওয়ায় অবশ্য দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্টলে স্টলে বই আনতে দেখা যায়। কিন্তু বাংলা একাডেমি তাদের সিদ্ধান্ত বদল করেনি।
মোট বিক্রি ১৭ কোটি টাকা
মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির তথ্য মতে, বইমেলায় মোট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫৮৪টি। এর মধ্যে ১৪টি ছিল মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫৭০টি। ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ৮ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ কোটি টাকা। আর বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই বিক্রি করেছে। প্রসঙ্গত, বইমেলায় বাংলা একাডেমিসহ সকল প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে।
এদিকে বাংলা একাডেমির তথ্য মতে, গতকাল মেলার শেষ দিনে বই এসেছে ২৩৬টি আর এবারের ১৮ দিনের মেলায় নতুন বই এসেছে ২০০৭টি। এর মধ্যে গল্প ২৭১টি, উপন্যাস ২৮৬টি, প্রবন্ধ ৮৭টি, কবিতা ৭৭১টি, গবেষণা ৪৪টি, ছড়ার বই ৩৫টি, শিশুতোষ বই ৮০টি, জীবনীগ্রন্থ ৫১টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ৬টি, নাটক ১০টি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই ২৫টি, ভ্রমণ বিষয়ক ৪০টি, ইতিহাস ২৮টি, রাজনীতি ২৪টি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ১৬টি, ভাষা বিষয়ক ৩টি, ধর্ম বিষয়ক ৩৫টি, অনুবাদ ২০টি, অভিধান ১টি, সায়েন্স ফিকশন ১ ও অন্যান্য ১৭৩টি।