বাংলাদেশে দুটি ইউরেনিয়াম খনি
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১২:২৭ পিএম
আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬ ১২:৫১ পিএম
ইউরেনিয়াম খনি থেকে উত্তোলনের পর আকরিককে যখন রাসায়নিকভাবে ঘনীভূত করা হয়, তখন তৈরি হয় এক উজ্জ্বল হলুদ পাউডার—যাকে বিজ্ঞানীরা ডাকেন ‘ইয়েলো কেক’ নামে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সিলেট ও মৌলভীবাজারে ইউরেনিয়ামের খনি থাকলেও উত্তোলনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সরকারের আন্তরিকতার অভাবে, নাকি কোনো ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, বিশেষজ্ঞরা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। তবে তারা বলছেন, এই ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা গেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির জন্য আর বিদেশমুখী হতে হতো না।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হারাগাছা ও সিলেটের জৈন্তাপুরে মাটির নিচে অব্যবহৃতভাবেই পড়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ ইউরেনিয়াম। দেশে ৫০ বছর আগে মূল্যবান এই ইউরেনিয়ামের সন্ধান মিললেও নেই উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ।
অথচ ইউরেনিয়াম তুলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়ামের বড় গ্রাহক। তাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিজস্ব চাহিদাও পূরণ করা যেত।
বাংলাদেশের জন্য একসময় ইউরেনিয়াম উত্তোলনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বর্তমানে সেই নিষেধাজ্ঞা নেই। তবুও ইউরেনিয়াম উত্তোলনে পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ কী, তা জানা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে আমাদের এখানকার ইউরেনিয়ামের মান ভালো এবং তা অতি উত্তম তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতেও সক্ষম।
একটি সূত্রমতে, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হারাগাছা ও সিলেট জেলার জৈন্তাপুর থেকে সংগৃহীত মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এখানে ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির হার ৫০০-১৩০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)। অন্যদিকে বিশ্বের যেসব খনি থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোতে ৩০০ থেকে ১০০০ পিপিএম ইউরেনিয়াম রয়েছে।
১৯৭৫ সালে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হারাগাছায় সন্ধান মেলে দেশের প্রথম ইউরেনিয়াম খনির। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভূতত্ত্ববিদ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল হারাগাছা পাহাড়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির সম্ভাবনার ব্যাপারে নিশ্চিত হন।
এরপর ওই পাহাড়কে তেজস্ক্রিয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে কমিশন। কিন্তু বাংলাদেশে তখন ইউরেনিয়াম ব্যবহার ও উত্তোলনের অনুমতি না থাকায় এ প্রকল্পের কাজ ওখানেই থেমে যায়।
এর দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে সিলেটে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আবারও আলোচনায় আসে হারাগাছার ইউরেনিয়াম। এ সময় ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়।
সেই সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন স্থানেও ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান চালায় আণবিক শক্তি কমিশন। ওই সময় সিলেটের জৈন্তাপুরে ইউরেনিয়ামের সন্ধান পায় পারমাণু শক্তি কমিশন।
অনুসন্ধান কাজে তাদের সহায়তা করেছিল ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর। কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকায় ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেলেও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে জৈন্তাপুরে ইউরেনিয়াম খনি নিয়ে গবেষণা বেশিদূর এগোয়নি।
ওই সময় মৌলভীবাজারের জুড়ীর হারাগাছা ও সিলেটের জৈন্তাপুর থেকে সংগৃহীত মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতি ১০ লাখ মাটিকণার মধ্যে রয়েছে ৫০০-১৩০০ ইউরেনিয়াম কণা।
অর্থাৎ পরীক্ষিত স্থানের মাটিতে ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির হার ৫০০-১৩০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)। কিন্তু তখনও বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের অনুমতি না থাকায় গবেষণা প্রক্রিয়া আবারও থেমে যায়।
এর ছয় বছর পর ১৯৯১ সালে হারাগাছায় ফের শুরু হয় অনুসন্ধান কাজ। ওই সময় হারাগাছা থেকে সংগৃহীত ইউরেনিয়াম আকরিক জাপানের আণবিক শক্তি কমিশনের জ্বালানি বিষয়ক গবেষণাগারে পাঠানো হয়।
পরীক্ষায় হারাগাছায় উন্নতমানের ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে ওই এলাকায় কয়েকটি কূপ খনন হলেও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম উত্তোলনের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তবে বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের সব বিধিনিষেধ উঠে যায়।
তাই এটি উত্তোলন করা গেলে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে এই ইউরেনিয়াম ব্যবহার হতে পারে। এতে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হতো।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এক সেমিনারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সম্মেলন কক্ষে তৎকালীন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. একেএম ফজলে কিবরিয়া জানান, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে মূল্যবান পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অঞ্চলে এই তেজস্ক্রিয় খনিজের ঘনত্বও অনেক বেশি। এখন সরকার এগিয়ে এলেই এই খনিজ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
ড. ফজলে কিবরিয়ার এ তথ্যের পর সিলেট ও মৌলভীবাজারে ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির বিষয়টি আবারও আলোচনায় ফিরে আসে।
এর আগে ২০০৯ সালের ২৯ নভেম্বর মৌলভীবাজার গিয়ে তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এনামুল হক বলেছিলেন, “হারাগাছার ইউরেনিয়াম আকরিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ না থাকায় এ প্রকল্প থেকে শিগগিরই ইউরেনিয়াম উত্তোলন কাজ শুরু হবে।” কিন্তু তার সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এ ছাড়া ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করতে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তবে সরকারের এমন আশ্বাসের পরও ইউরেনিয়াম উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় সরকারের উচ্চমহল থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এ সম্পর্কে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড পলিমার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মুহিবুল আলম বলেন, “ইউরেনিয়াম খুবই মূল্যবান এবং সেনসেটিভ বিষয়। সঠিক উপায়ে তুলতে না পারলে জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় আঘাত আসবে। ইউরেনিয়াম উত্তোলন করার যে আধুনিক প্রযুক্তি তা আমাদের কাছে নেই, রাশিয়াসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ এ ব্যপারে অভিজ্ঞ। তাদের সহযোগিতায় জীববৈচিত্র্যকে নিরাপদ রেখে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করতে পারলে রাষ্ট্র লাভবান হবে।”
তিনি বলেন, “ইউরেনিয়াম দেশের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে ব্যবহারের পাশাপাশি উন্নত বিশ্বে রপ্তানি সম্ভব। তবে কী পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ আছে এবং তা উত্তোলনযোগ্য কি না, এসব বিষয় বিশেষজ্ঞ দিয়ে দ্রুত যাচাই করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?”