ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ১১:২৮ এএম
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
সরকারি উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দীর্ঘদিন ধরে দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং কর্মকর্তাদের বদলিÑ সব মিলিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরে একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার অভিযোগ বহুদিনের। বিভিন্ন সময় সরকার বদলালেও এই চিত্রের বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে। তবে এ বিষয়ে নতুন সরকার শুরুতেই কঠোর হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।
সরকারি উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য বিভাগের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আলোচনা হয়েছে। সেখানে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি একটি বড় প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হতে পারে। খাদ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম ও প্রশাসনিক সূত্রে উঠে এসেছে খাদ্যগুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, পরিবহন ব্যয় এবং সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের খবর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিশেষ করে এলএসডি (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) গুদামগুলোকে কেন্দ্র করে একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে। এসব গুদামের দায়িত্ব পেলে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে। ফলে অনেক কর্মকর্তা এসব পদে যেতে আগ্রহী। বিগত সরকারের আমলে বিশাল টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য হওয়ায় তারই ধারাবাহিকতা নতুন সরকারের আমলেও শুরু করেছিল সেই সিন্ডিকেট। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বদলি কাযক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এলএসডি গুদামগুলোতে পদায়নের জন্য অনেক সময় অঘোষিতভাবে অর্থ লেনদেন হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে বদলির নজির রয়েছে বলে খাদ্য বিভাগে আলোচনা আছে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে এই ধরনের বদলি বাণিজ্যের ঢের অভিযোগ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নজির নেই বলে সূত্র জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগীয় খাদ্য দপ্তরের দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তারা হলেনÑ খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন। তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। শুধু এই দুই কর্মকর্তা নয়, আরও কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এখনও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বহাল রয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তারা যৌথভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্যগুদামে বদলি বাণিজ্য, ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম এবং সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাসময়ে অফিসে হাজির থাকার কথা থাকলেও তারা উপস্থিত থাকছেন না। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এবার নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে যাওয়ায় তদন্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগসহ কয়েকটি অঞ্চলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে তদেন্ত করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধু খাদ্য বিভাগ নয়, প্রশাসনের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিষয়গুলো নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্র থেকে জানা গেছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি সমন্বিত শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে পারে। এই অভিযানে তদন্তের আওতায় আসতে পারেÑ খাদ্যগুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম, বস্তা ও অন্য সরঞ্জাম ক্রয়, কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন। এছাড়াও রয়েছে পরিবহন ব্যয় ও ঠিকাদারি কার্যক্রম।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে বদলি কিংবা পদায়ন, খাদ্য সরবরাহ, ওএমএসসহ অন্যান্য বিষয়ে কঠোরভাবে তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, খাদ্য বিভাগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিষয়ে তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণ হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেছেন, বর্তমান সরকার খাদ্যগুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ এবং ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়। কোনো অযাচিত কাজ বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর মনে করেন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। এখানে দুর্নীতি হলে তা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। তাছাড়া খাদ্য বিভাগের দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণÑ এ তিন ধাপে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে। খাদ্য বিভাগের অনিয়মের প্রভাব শুধু প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষক ও বাজারব্যবস্থার ওপরও। ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম হলে অনেক সময় কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না।
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড, শহীদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করে। কিন্তু যদি সেখানে দুর্নীতি থাকে, তাহলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। গুদাম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম থাকলে খাদ্যশস্যের অপচয়ও বাড়ে। সরকারের শুদ্ধি অভিযান একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তবে তা ধারাবাহিক করতে হবে।
সরকারকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে ড. শহীদুজ্জামান বলেন, সব খাদ্যগুদামের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্লাটফর্মে আনতে হবে। কর্মকর্তা বদলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাধীন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। দোষ প্রমাণিত হলে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রশাসনে সংস্কার আনতে হলে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে দুর্নীতি আবার ফিরে আসবে।