ঈদযাত্রা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৭ এএম
ঈদের ছুটি শুরু না হলেও নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন অনেকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে শিশু সদস্যদের নিয়ে ট্রেনের অপেক্ষায় একটি পরিবার। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ। ট্রেন ও সড়কপথে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের উপস্থিতিও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই এই দুই পথেই আগেভাগে যাত্রা শুরু করেছেন।
ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই ট্রেনে বাড়ি ফিরতে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে বিভিন্ন বয়সী যাত্রীদের ভিড় লক্ষ করা গেছে। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের আগেভাগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে সকাল থেকে স্টেশনে আসেন।
স্টেশনে উপস্থিত অনেক যাত্রী জানান, হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকায় এবং ঈদের ঠিক আগের দিনের অতিরিক্ত ভিড় ও ভোগান্তি এড়াতেই তারা আগেভাগে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ পথ ভ্রমণের জন্য ট্রেনই আরামদায়ক। ভোগান্তি এড়াতে অনেক যাত্রী একটু আগেভাগে রওনা হয়েছেন। উত্তরবঙ্গগামী এক যাত্রী বলেন, ঈদ এলেই বাড়ির টানটা একটু বেশিই অনুভূত হয়। তাই ভোগান্তি এড়াতে আগেভাগে রওনা হয়েছি। দীর্ঘ পথের যাত্রায় ট্রেনে ক্লান্তি অনেক কম লাগে। জামালপুরগামী ট্রেনের যাত্রী মেহেদী হাসান আরও জানান, ঈদের সময় ভিড় অনেক বেড়ে যায়। তাই আগেভাগেই পরিবার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি।
গত ১৩ মার্চ থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ঈদ উপলক্ষে ট্রেনযাত্রা শুরু হয়েছে। শনিবার ছিল ট্রেনযাত্রার দ্বিতীয় দিন। কমলাপুর স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্টেশনের প্রবেশপথে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুই দফায় টিকিট পরীক্ষা করে যাত্রীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বরত ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনাররা (টিটিই) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, টিকিট ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
শনিবার ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ৩০টি আন্তঃনগর ট্রেন ছেড়ে গেছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। এই ৩০টি আন্তঃনগর ট্রেনে মোট আসন ২৮ হাজার ৯২৬টি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের ২৩টি ট্রেনে ১৬ হাজার ১৯৪টি এবং পশ্চিমাঞ্চলের ৭টি ট্রেনে ১২ হাজার ৭৩২টি আসন গত ৪ মার্চ অনলাইনে বিক্রি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সড়পথের ঈদযাত্রাতেও ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাসস্টেশনে দুপুর থেকেই ঘরমুখো যাত্রীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনালে ময়মনসিংগামী যাত্রী আসমা তার পরিবারের চার সদস্য নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি জানান, ঈদে যানজট এড়াতে একটু আগেভাগেই রওনা হয়েছেন।
গাবতলী বাস টার্মিনালে বগুড়াগামী যাত্রী রাইসুল ইসলাম বলেন, এবার জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই আগে থেকেই বাড়িতে রওনা হয়েছেন। ফেনীর বাসের জন্য অপেক্ষমাণ ব্যাংক কর্মকর্তা সাজিদুর রহমান তার পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে রওনা হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি আপাতত জটিল মনে হচ্ছে না। নির্বিঘ্নে যাত্রা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে।’ বাস টার্মিনালগুলোতে পুলিশ ও র্যাবসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও লক্ষ করা গেছে।
সেবা খাতে বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি দূর করার আহ্বান : জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন সেবামূলক খাতে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের জনগণ যেন নির্বিঘ্নে চলাচল ও প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারে, সেজন্য পরিবহন সেক্টরসহ সব পর্যায়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, পরিবহন খাতে নানা ধরনের অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, চাঁদাবাজি এবং যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
তিনি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের স্বার্থ রক্ষায় পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সকল ধরনের অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা প্রয়োজন। সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে হুঁশিয়ারি, ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ : ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। তবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কাজ করা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকা নিয়ে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে অনুষ্ঠিত ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে ও চাঁদামুক্ত করার লক্ষ্যে মালিক-শ্রমিক মতবিনিময় সভায় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল আলম বাতেন অভিযোগ করেন, টার্মিনালের ভেতরে শৃঙ্খলা থাকলেও সাভার, নবীনগর ও চন্দ্রার মতো পয়েন্ট থেকে যাত্রী তোলার সময় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা যায় এবং মফস্বল থেকে আসা বাসগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। তিনি সাংবাদিকদের সঠিকভাবে তদন্ত করে রিপোর্ট করার আহ্বান জানান, যাতে জনমনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
গণপরিবহনের তেলের রেশনিং তুলে দেওয়া হচ্ছে : সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যে গণপরিবহনের তেলের রেশনিং পদ্ধতি তুলে দেওয়া হবে। গণপরিবহনের জন্য জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের আর কোনো সীমা থাকবে না। শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে তিনি এ কথা জানান।
মন্ত্রী আরও জানান, দূরপাল্লা ও গণপরিবহনে তেলের রেশনিং শনিবার রাত থেকেই আরোপিত থাকবে না। তবে ব্যক্তিগত যানবাহনের ক্ষেত্রে সরকারের নতুন কোনো নির্দেশনা এখনও আসেনি।
ঈদের আগে-পরে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ : যানজট কমাতে ঈদের আগে ও পরে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. সরওয়ার। গতকাল শনিবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে বাসমালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলে।
ডিএমপি কমিশনার জানান, যাত্রীদের সেবা নিশ্চিত করতে টার্মিনালগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। এছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, র্যাব এবং সাদা পোশাকে পুলিশও দায়িত্ব পালন করবে।
অতিরিক্ত ভাড়া ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বলছে, বিভিন্ন পথের গণপরিবহনে এখনও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলমান, আর টার্মিনাল পরিদর্শনের নামে কিছু অভিযান কার্যকর নয়।
শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ভাড়া আদায়ের পুরনো নৈরাজ্য বিদ্যমান। সরকার কাঠামোগত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারেনি এবং আইন অনুযায়ী পরিবহনগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। নতুন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী বাস ও লঞ্চ ভাড়া না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে বিভিন্ন বাসে এসি সিটে দ্বিগুণ, নন-এসি সিটে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে গাজীপুর, ঢাকা থেকে মাওয়াসহ আন্তঃজেলা সার্ভিসের বাসগুলোতে ৮০ টাকার ভাড়া বিভিন্ন বাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অনতিবিলম্বে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অনিয়ম বন্ধ করার আহ্বান জানান।