অমর একুশে বইমেলা
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৭ এএম
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বই বিক্রি আর লোক সমাগমের দিক থেকে গতকাল শুক্রবার ছিল আশা জাগানিয়া। একুশে বইমেলার ১৬তম দিনে শিশুপ্রহরে সকাল ১১টায় মেলার প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়া হয়। এরপর রাত ৮টা পর্যন্ত প্রকাশকদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তিরও সমন্বয় ঘটে। কিন্তু রাত ৮টার দিকে হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকা প্রকাশকদের প্রত্যাশা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
প্রকাশকরা বলছেন, এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। হঠাৎ বৃষ্টিতে বেশিরভাগ প্রকাশনীর বই ভিজে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্টলের কাঠামো। অথচ এর আগে সন্ধ্যা পর্যন্ত জনসমাগম দেখে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, বিদায়ের আগে যেন জ্বলে উঠল এবারের বইমেলা। তারা বলেন, প্রত্যাশা ছিল শুক্র ও শনিবার বইমেলা জমে উঠবে। আমাদের সেই প্রত্যাশার কিছুটা পূরণ হয়েছে। কিন্তু তা আনন্দমুখর হয়ে ওঠার আগেই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল।
এদিকে, গতকাল বইমেলার
প্রথম প্রহর ছিল শিশুদের জন্য। এ সময়ে বিভিন্ন বয়সী শিশুদের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতিতে মেলা
প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। বেলা ১১টায় মেলা শুরুর পর থেকেই অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে
মেলায় আসেন। শিশুপ্রহরের প্রধান আকর্ষণ ছিল পাপেট শো। কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের মঞ্চে
শুরু হয় এই আয়োজন। ছোট ছোট রঙিন পুতুলÑ কখনও পাখি, কখনও বনজ প্রাণীÑ আর তাদের মজার
গল্পে মুহূর্তেই জমে ওঠে মঞ্চের সামনে। পুতুলের এই অভিনব গল্প বলা যেন শিশুদের কল্পনার
দরজা খুলে দেয়।
পাপেট শোর চরিত্রগুলোও
ছিল দারুণ আকর্ষণীয়Ñ ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য ইতু, বাঘ মামা, মায়া হরিণ, কচ্ছপ, ছাগল, কাঁক
আর খরগোশ। তাদের নিয়েই সাজানো হয়েছিল একের পর এক গল্প। পুতুল নাটকের অংশ হিসেবে মঞ্চস্থ
হয় তিনটি গল্পÑ ‘বনভ্রমণ’, ‘অপু দীপুর গল্প’ এবং ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’। শিশুদের
সামনে গল্পগুলো উপস্থাপন করে পাপেট আলো এবং ব্লু। গল্প পাঠ করেন গল্প পাঠক কাজী শামস
তাথৈ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রশিক্ষক মোনামী ইসলাম কনক।
এদিকে গতকাল শুক্রবার
অমর একুশে বইমেলার ১৬তম দিনে নতুন বই এসেছে ২৭৭টি। আর এবারের মেলায় এখন পর্যন্ত মোট
নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৬১৪টি। এবারের মেলার শুরুর দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকাশনা
সংস্থা ঘুরে ঘুরে নানা বিষয়ের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সংগীত বিষয়ে বেশ কিছু ভালো বইয়ের
খোঁজ মেলে। এর মধ্যে স্বপ্ন ৭১ প্রকাশ করেছে গবেষক ইমরান উজ-জামানের গীতিনাট্য ‘লিলুয়া
সুন্দরীর পালা’; প্রকাশনা সংস্থা নাগরী প্রকাশ করেছে মোহাম্মদ শেখ সাদীর ‘বাংলাদেশের
লোকগান : উৎস ও সরূপ-সন্ধান’ শীর্ষক বইসহ সিলেট অঞ্চলের বাউল-সাধক শিতালং শাহ, রাধারমণ
দত্ত, সৈয়দ শাহনূর, হাসন রাজা, রইস রহমান, মনির নূরী, অন্নদারঞ্জন দাশ, তাজউদ্দিন,
ছেগেন শাহ, জুনেদ শাহ, মালেক শাহ, আরকুম শাহ, জুনায়েদ মুনশি, দীন শরৎ, বশির উদ্দিনের
গানের সংকলন।
আজব প্রকাশনী থেকে
এসেছে মাহমুদ মানজুরের ১২ জন গীতিকবির জীবন নিয়ে রচিত গীতিজীবন। এ ছাড়াও আজব প্রকাশনী
প্রকাশ করেছে গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিভিন্ন বরেণ্যদের স্মৃতিচারণে
বই ‘গানে গানে সত্তর’। এ ছাড়াও জয়তী প্রকাশ করেছে মোহাম্মদ আলী আখন্দর হামেশা জওয়া
গীত; পুঁথিনিলয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে শোলাশিল্প নিয়ে রওশন জাহিদ ও রতন কুমারের বই।
শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন,
আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান : গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর
চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে
স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির
মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা
: ক-শাখায় ১ম হয়েছে আফ্ফান আল হাসনাইন, ২য় হয়েছে আনহিতা রেদোয়ান আভা, ৩য় হয়েছে রিসালাত
শাহ। খ-শাখায় ১ম হয়েছে চারুলতা রহমান জারা, ২য় হয়েছে বায়ান রাশদান, ৩য় হয়েছে দ্যুলোক
দ্যুতিমান। গ-শাখায় ১ম হয়েছে শ্রেয়া রায়, ২য় হয়েছে স্বস্তি চৌধুরী, ৩য় হয়েছে আদিত্য
সাহা।
আবৃত্তি প্রতিযোগিতা
: ক-শাখায় ১ম হয়েছে পূর্ণতা আদিত্য, ২য় হয়েছে সাহানা ইসলাম সাইফা এবং ৩য় হয়েছে আরওয়া
রহমান তাজরি। খ-শাখায় ১ম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছে বেহজারিন হাসান তারফি
এবং ৩য় হয়েছে কারিমা হোসাইন দিয়া এবং গ-শাখায় ১ম হয়েছে সিমরিন শাহীন রুপকথা, ২য় হয়েছে
রাজ্যশ্রী সাহা এবং ৩য় হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ।
সংগীত প্রতিযোগিতা
: ক-শাখায় ১ম হয়েছে শ্রীজা মন্ডল, ২য় হয়েছে মাগফিরাহ্ মাবরুরা তৈষী এবং ৩য় হয়েছে হিয়াঞ্জলি
তরফদার। খ-শাখায় ১ম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছে সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছে বিদ্যাস্তুতি
সিংহ। গ-শাখায় ১ম হয়েছে রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছে তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য়
হয়েছে নাবিলা আক্তার রায়না।
অন্যদিকে, বইমেলার
মূলমঞ্চে বেলা ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : বদরুদ্দীন
উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন
সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। আলোচনা-পরবর্তী
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)।
এতে জাসাসের শিল্পীরা পরিবেশন করেন কবিতা আবৃত্তি, সংগীত এবং নাতে রাসুল পরিবেশন করেন।
আর, মেলার লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেনÑ নাসির আলী মামুন
এবং মোহন রায়হান।
আজকের বইমেলা :
আজ শনিবার, অমর একুশে বইমেলার ১৭তম দিন। এদিনের মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে
রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। বেলা ৩টায়
মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
আলোচনা-পরবর্তীতে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।