প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:২১ এএম
সাধারণত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এই বাণিজ্য তদন্তের মুখে পড়েছে বাংলাদেশও। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্ববাজারে পণ্যের অতিরিক্ত উৎপাদন মার্কিন উৎপাদন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে নতুন করে বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১-এর অধীনে এই তদন্ত শুরু করেছে।
সাধারণত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’ মোকাবিলায় ওয়াশিংটন কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাণিজ্যিক নীতি বা কর্মকাণ্ড মার্কিন স্বার্থের জন্য ‘অযৌক্তিক’ বা ’বৈষম্যমূলক’ কি না ও তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।
গত বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউএসটিআর জানায়, বাংলাদেশ ছাড়াও এই তদন্তের তালিকায় রয়েছেÑ চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত।
এই উদ্যোগের ব্যাখ্যায় ইউএসটিআর বলেছে, সরবরাহ শৃঙ্খল আবার দেশের ভেতরে ফিরিয়ে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের জন্য ভালো বেতনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। সংস্থাটি মনে করছে, অনেক বাণিজ্যিক অংশীদার তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য উৎপাদন করছে, যার ফলে বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “অন্যান্য দেশ তাদের অতিরিক্ত উৎপাদন বা সমস্যার বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিয়ে মার্কিন শিল্প খাত ধ্বংস করতে পারবে না।” তিনি বলেন, ‘এই তদন্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইন দেশে ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন খাতে আমেরিকান শ্রমিকদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্তে বাংলাদেশের নাম আসাকে অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। বাংলাদেশের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, ১৬ দেশের কোথাও অন্যায্য চর্চা, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রণোদনা প্রদান এবং মেধাস্বত্বের লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটছে কি না, সেসব খতিয়ে দেখতে তারা শুনানি করবে। এমন অভিযোগের প্রমাণ পেলে হয়তো তারা বাড়তি শুল্ক বসাতে পারে।”
ইউএসটিআর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই উদ্বৃত্তের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক বা টেক্সটাইল খাত। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার টেক্সটাইল ও চামড়াজাত পণ্যসহ মোট ৪৩টি খাতে রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদনে মেধাস্বত্বের চর্চা এখনও সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারও খুবই ছোট। শ্রম অধিকারের বিষয়েও ইতোমধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।” তার মতে, “পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ যে প্রণোদনা দেয়, তা খুবই সীমিত। কৃষিতে প্রণোদনার বিষয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও কৃষি খাতে প্রণোদনা দিয়ে থাকে।” বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকার মূলত সারে প্রণোদনা প্রদান করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউএসটিআরের বিবৃতিতে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্প নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দেশটির সিমেন্ট শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিমেন্ট ব্যবহার ছিল প্রায় ৩৮ মিলিয়ন টন, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালে এই ব্যবহার আরও কমেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার সতর্ক করে বলেন, অনেক খাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়েছে অথবা বিদেশি প্রতিযোগীদের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাজার বিকৃতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
তবে মাহমুদ হাসান খানের মতে, “যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত নিজেদের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন তদন্ত শুরু করেছে।” তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার হলেও সেখানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক, যা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা নিজেরা উৎপাদন করতে আগ্রহী নন।” এ কারণে তদন্তে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে তিনি যৌক্তিক মনে করেন না।
তিনি বলেন, “যেহেতু তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম এসেছে, তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অগ্রিম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও যুক্তি দিয়ে এই তদন্তের মুখোমুখি হওয়া যায়।”
ইউএসটিআর জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে আগামী ১৭ মার্চ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর লিখিত মতামত জমা দেওয়া এবং গণশুনানিতে অংশ নেওয়ার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। ১৫ এপ্রিল রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত লিখিত মতামত, শুনানিতে অংশগ্রহণের আবেদন এবং সম্ভাব্য বক্তব্যের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়া যাবে। এই সময়সীমার মধ্যে জমা দেওয়া মতামতগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তদন্তের অংশ হিসেবে সেকশন ৩০১ কমিটি আগামী ৫ মে ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশনের প্রধান শুনানি কক্ষে গণশুনানি শুরু করবে। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই শুনানি প্রয়োজন হলে ৮ মে পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছে ইউএসটিআর।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, গণশুনানি শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে লিখিত জবাবি মন্তব্য বা পাল্টা মতামত জমা দিতে হবে। লিখিত মতামত, শুনানিতে অংশগ্রহণের আবেদন, বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এবং শুনানির পর জবাবি মন্তব্য ইউএসটিআরের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে জমা দিতে হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।