ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৭ এএম
ঢাকার কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে মঙ্গলবার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে কার্ড পেয়ে উচ্ছ্বিসিত নারীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
“আমার সংসারে অভাব আছিল না। বাপের ঘরে না, স্বামীর ঘরেও না। কিন্তু কী দিয়া কী হইলÑ দুর্যোগে আর অসুখ-বিসুখে বাপের সম্পত্তি সব শেষ হয়্যা গেল। গেল ৩০ বছর ধইরা আমার স্বামীর সংসারেও অভাব আর অভাব লাইগা আছে। এহন হাতে একখান কার্ড পাইলাম। মাসে আড়াই হাজার টাকা পামু। আমাগারে অভাবের সংসারে এই আড়াই হাজারই ম্যালা। আমার কপাল খুইলছে বাপ।”
বলছিলেন হাজেরা খাতুন। বয়স তার ৮০ ছুঁইছুঁই করছে। প্রতিবেশী রিনা খাতুনের হাত ধরে তিনি টিঅ্যান্ডটি মাঠে এসেছিলেন ফ্যামিলি কার্ড নিতে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার কড়াইল বস্তি সংলগ্ন ওই মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের এই কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে দেশের ১৩টি জেলা/সিটি করপোরেশনের ১৪টি ওয়ার্ডে পাইলটিং প্রকল্প হিসেবে এ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে।
হাজেরা খাতুন জন্ম নিয়েছিলেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা থানায়। কিন্তু এখন আর সে জায়গা তিনি চিনতে পারবেন না। কারণ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি এখন এই কড়াইল বস্তিতেই বাস করছেন। ফ্যামিলি কার্ড হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হাজেরা খাতুন বলছিলেন, “পাকিস্তান দেখছি। এহন বাংলাদেশ দেখতেছি। এই পয়লা এরহম সাহায্য নিতেছি। কী করমু বাপ-স্বামীর অসুখ, আয়-রোজগার আর করতে পারে না। ছেলে আছে, ছেলের বউ আছে। ছেলে একটা দোকানে কাজ করে। তাতে কি আর সংসার চলে? কার্ড পায়া খুব ভালো হইছে আমার।”
গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচি উদ্বোধন করতে গিয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন পারভিন বেগমসহ ১৭ জন নারীর হাতে। কার্ড পেয়ে সাততলা বস্তির রিনা বেগম বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমার তিন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে, ছেলে পড়ে ক্লাস সেভেনে। আর ছোটটার বয়স মাত্র ৫ বছর। এই কার্ডের টাকা পেলে ছেলেমেয়েদের অন্তত খাতা-কলম কিনে দিতে পারবে। আপদে-বিপদে চাল-ডাল কিনতে পারব।” তিনি বলেন, “জীবনে চিন্তাও করতে পারি নাই, এরকম কার্ড হাতে পাব। এটা অনেকটা স্বপ্নের মতো।”
ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দা ও কার্ডের সুবিধাপ্রাপ্ত রাশেদা আক্তার অনুষ্ঠান মঞ্চে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমি ভাসানটেক বস্তি থেকে এসেছি। এই কার্ড দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ। প্রধানমন্ত্রী আপনি ল্যাপটপে টিপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক আমার মোবাইলে টাকা চলে এসেছে। আমি টাকা পেয়ে খুশি। এই টাকা দিয়ে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে পারব। কেননা একজনের ইনকামে সংসার চলে না। প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ও আপনার পরিবারকে ধন্যবাদ।”
কয়েক মাস আগে কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে যাদের ঘর-বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল, তাদেরই একজন হচ্ছেন সেলিমা খাতুন। তিনিও ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। পেয়েছেন মোবাইলে মেসেজ। কিন্তু বিকাশে সত্যিই টাকা যুক্ত হয়েছে কি নাÑ তা নিয়ে মনে সংশয় ছিল তার। তাই অনুষ্ঠান শেষে তিনি যান তিতুমীর সরকারি কলেজের পাশে বিকাশের দোকানে। সেখানে গিয়ে টাকা তুলতে পেরে আনন্দে তিনি আত্মহারা হয়ে যান। বলেন, “এত সহজে টাকা তোলা যাবে, ভাবতেও পারিনি।”
কড়াইল বস্তির আরেক বাসিন্দা আমেনা আক্তার জানান, তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫। এক ছেলে প্রতিবন্ধী। ইতঃপূর্বে কোনো ভাতা বা টিসিবি কার্ডও তিনি পাননি। প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে আনন্দে আপ্লুত আমেনা আক্তার। তবে তিনি বলেন, “সত্যি কথা বলতে, বাজারদর যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই টাকা কিছুই না। আগামীতে এই টাকার পরিমাণ বাড়ানো দরকার; যাতে একটি পরিবারের অন্তত ১০ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।”
অনুষ্ঠানস্থলে আসা রিনা খাতুন কার্ডের জন্য নাম দিলেও তার কার্ড হয়নি। তিনি আশা করছেন, আগামীতে তার কার্ড হবে। তখন অন্যদের মতো তিনিও এ সুযোগ-সুবিধায় উপকৃত হবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফারজানা শারমীন বলেন, “কন্যা, জায়া-জননী যেভাবেই সম্বোধন করি না কেন, একজন নারী একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সূর্য ওঠার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি মায়া-মমতা দিয়ে তার সংসারকে সাজান। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সংসার সামলান।” তিনি বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড শুধু সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নয়, বরং এটি খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টির উন্নয়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সর্বোপরি নারীর অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি।”
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, “জনবান্ধব এ কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিভিন্ন সূচক অর্জনে কাজ করা হচ্ছে।”