মাসুদ রানা
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৮ এএম
১৯৭১ সালের ১১ মার্চ সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সব সরকারি-আধাসরকারি ভবন ও বাসগৃহের শীর্ষে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়তে থাকে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ১১ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের চতুর্থ দিন। পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চরম অবস্থায় উপনীত হয়। কুর্মিটোলা মার্শাল ল’ অফিস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন হয়নি। সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সব সরকারি-আধাসরকারি ভবন ও বাসগৃহের শীর্ষে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়তে থাকে।
এই দিনে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক বিশাল জনসভায় বলেন, “স্বাধীনতা ছাড়া আপসের আর কোনো পথ খোলা নাই।” বাঙালিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন।”
আতাউর রহমান খান অন্য এক জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসতে জনগণকে উদাত্ত আহ্বান জানান।
এই দিন তাজউদ্দীন আহমদ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি জাতীয় জীবনের অপরিহার্য অর্থনৈতিক ও জনজীবনের অন্যান্য অপরিহার্য কার্যকলাপ পরিচালনার একটি বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থা সর্বাধিক এবং অর্থনৈতিক তৎপরতা পুরোদমে চালিয়ে যেতে সব শক্তি নিয়োজিত করতে বলেন।
তিনি পূর্ব বাংলার অর্থনীতি ধ্বংস ও ক্ষুধার্ত জনগণের দুঃখ-কষ্ট বাড়ানোর যে কোনো দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার থাকতে বলেন। কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা, ন্যায়নিষ্ঠা ও ত্যাগের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার তাগিদ দেন তিনি। সংগ্রাম চলাকালীন সর্বাধিক সমস্যা সাধনের জন্যও জনগণকে প্রস্তুত থাকতে বলেন।
এই দিনে ছাত্র ইউনিয়ন এক প্রচারপত্রে মানুষের করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি দিকনির্দেশনা দেয়। এতে সমগ্র বাংলাদেশকে এক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে বলেন, ৬ মার্চের বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া বিক্ষুব্ধ বাঙালি জনগণকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দেন। শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাতের আগেই ইয়াহিয়াকে তার ৬ মার্চের বেতার ভাষণ প্রত্যাহার করতে হবে।
ঢাকাস্থ জাতিসংঘের প্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি এমন নয় যে, জাতিসংঘের কর্মচারীদের অন্যত্র অপসারণ করতে হবে।”
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে ইয়াহিয়ার বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলতে থাকে।
অসহযোগ আন্দোলন জেলখানায়ও ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কারাগারের কয়েদিরা আন্দোলন করতে থাকে। এই দিনে কুমিল্লা কারাগার থেকে কয়েদি ও বিচারাধীন আসামি জেল ভেঙে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে ৩ জন কয়েদি ঘটনাস্থলে নিহত হয়।
বরিশাল কারাগার থেকে ৪০ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলিতে ২ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়।
রাজশাহীর সিনেমা হলগুলোতে এই দিনে বাংলা ভাষার সিনেমা ছাড়া অন্য কোনো সিনেমা চলেনি। সিনেমা হলগুলোতে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বাজানো হয়। এই দিনে পাকিস্তানি সেনারা রাজশাহীর বেলদারপাড়ায় গিয়ে দুই জনকে হত্যা করে।
এই দিনে ফরিদপুর জেলার সকল পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কাজে যোগদান না করায় ফরিদপুরের সকল অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়। সিএসপি ও ইপিসি সমিতির পদস্থ বাঙালি সরকারি কর্মচারীরা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচি থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটি তারবার্তায় বলেন, “উদ্ভূত সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। আমরা বিরাট সংকটের মুখোমুখি। দেশের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত।”