× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত জাতীয় অর্থনীতিতে

আরমান হেকিম, ঢাকা ও হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ১০:০৬ এএম

হরমুজ প্রণালির স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: গেটি ইমেজেস

হরমুজ প্রণালির স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: গেটি ইমেজেস

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে চাপ বাড়ছে মূল্যস্ফীতি ও ডলারের ওপর। সেই সঙ্গে রপ্তানি বাণিজ্যে হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভর রেমিট্যান্স প্রবাহে ঝুঁকির আশঙ্কায় দেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালীর মাধ্যমে হয়। ফলে এই পথ ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে উল্লেখ করে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এরই মধ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমান চলাচলেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ এতে জরুরি পণ্য রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি আমদানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আট দেশে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ, তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং শাকসবজি রপ্তানি করে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুযারি পর্যন্ত সাত মাসে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশে মোট ৩০ কোটি ৫৬ লাখ ৪২ হাজার ৫২০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়েছে ২৩ কোটি ৬৪ লাখ ৮১ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য। এ ছাড়া ইরাকে ২৩ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৬ মার্কিন ডলার, ইরানে ৭০ লাখ ৪৯ হাজার ১৮০ মার্কিন ডলার, জর্ডানে ১ কোটি ৭৮ হাজার ৪৪৬ মার্কিন ডলার, কুয়েতে ১ কোটি ৭০ লাখ ৭ হাজার ৬৬৫ মার্কিন ডলার, লেবাননে ৫১ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ মার্কিন ডলার, ওমানে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৩ মার্কিন ডলার এবং বাহরাইনে ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ১৬২ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। 

সে হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওই ৮ দেশে গড়ে প্রতি মাসে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ২১৭ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই বাজারে গত ৯ দিন ধরে বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না। রপ্তানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনারগুলো বিভিন্ন বন্দরে আটকে আছে।

বিডি সি-ফুড লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) ফারুক উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি পণ্য ভর্তি তাদের দুটি কন্টেইনার কলম্বো বন্দরে আটকা পড়েছে। এর মধ্যে একটি কন্টেইনার কুয়েতের শুওয়াইখ বন্দরে, আরেকটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা বন্দরে পৌঁছার কথা। চলতি সপ্তাহে আরও একটি কন্টেইনার শারজায় পাঠানোর কথা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা সাহস পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন্স আজমীর হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত ২ মার্চ থেকে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার বুকিং বন্ধ রেখেছি। শুধু আমাদের শিপিং লাইন না, অন্যান্য শিপিং লাইনও ওইসব দেশের রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার বুকিং বন্ধ রেখেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলোতে সপ্তাহে রপ্তানি পণ্যের ১৫০০ থেকে ১৬০০ একক কন্টেইনার পরিবহন করা হতো। এখন বুকিং বন্ধ থাকার কারণে এই পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। একইভাবে ওইসব দেশ থেকে পণ্য আমদানিও থমকে আছে।

পোশাক রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকেও চাপ পড়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই এই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকদের। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে ভোক্তাদের সক্ষমতা কমবে, ফলে তারা পোশাকের মতো পণ্যে কম ব্যয় করবেন।’ তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের যদি বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হয়, তাহলে সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। প্রচলিত রুটে ঝুঁকি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ ও কার্গো বিমানকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে তুলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এতে দেশের মিল ও কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।

সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছোট জাহাজে পণ্য প্রথমে কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং বন্দরে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। এসব জাহাজ সাধারণত সুয়েজ খাল হয়ে অথবা আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে। জানা যায়, দুই বছর আগে গাজায় সংঘাত শুরুর পর লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক শিপিং কোম্পানি সুয়েজ খাল ব্যবহার কমিয়ে দেয়। ফলে জাহাজগুলোকে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। 

বর্তমান পরিস্থিতিতেও শিপিং কোম্পানিগুলো পরিবহন ভাড়া বাড়াতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা বিদেশি ক্রেতারা এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ স্থানীয়দের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। আমদানিকারকরা জানান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহন ভাড়া প্রতি টনে ৮ থেকে ১০ ডলার বেড়েছে। সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টনে ৩০ থেকে ৪০ ডলার এবং পাম তেলের দাম ১০ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।

পরিবহন ব্যয় বেড়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে সারচার্জ আরোপ করেছে। শিপিং কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিটি কন্টেইনারে সর্বনিম্ন ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় হিমায়িত কন্টেইনারে এই মাসুল চার হাজার ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত রবিবারও ২৬টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ জানান, ‘গত ৯ দিনে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০।’ 

রেমিট্যান্সে শঙ্কা

বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন গেছেন সৌদি আরবে। এরপরে বড় গন্তব্য কাতার। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে উল্লেখ করে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্সে কিছু প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রবাসীদের সহায়তায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।’ 

জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যে চাপ

যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং তা ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল কাবি সতর্ক করে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছতে পারে।’

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের প্রভাব দুইভাবে পড়তে পারে। প্রথমত, বিদ্যমান বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারেন।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা