× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশ বেতার

পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ০১:৩৭ এএম

বাংলাদেশ বেতার। ছবি: বাসস

বাংলাদেশ বেতার। ছবি: বাসস

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারের পরিচালকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বেতারের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং সাবেক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তোলা হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হয়নি। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও জনস্বার্থ রক্ষায় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, অনৈতিক পদোন্নতি এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা—এই চারটি মৌলিক ইস্যুতে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, পদোন্নতি প্রক্রিয়া এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা-এই চারটি মূল ইস্যুতে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পদোন্নতির প্রশ্ন

অভিযোগ রয়েছে পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) রুবায়েত শামীম চৌধুরী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় উপসচিব পদোন্নতি পেয়েছেন। ওই সময় তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিপুলসংখ্যক গান রচনা ও সুরারোপ করেন। সেই কাজকে সামনে এনে ২০২১ সালে উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সখ্য গড়তে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের নিয়ে গান রচনাও শুরু করেন-এমন অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি একটি নির্ধারিত নীতিমালা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। যদি রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত প্রভাব পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, তবে তা প্রশাসনের পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। 

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত রুবায়েত শামীম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বেতারের সরকারি গাড়ি ব্যবহার ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিতর্ক 

বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বিশেষ কোটা থেকে প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব হন। এরপর সরকারের দেওয়া উপসচিবদের সুবিধা অনুযায়ী সরকারি গাড়ি ক্রয় বাবদ আর্থিক সুবিধা এবং মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানিও ভাতা পান। অভিযোগ রয়েছে, নিজের বরাদ্দ গাড়ি ব্যবহার না করে বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রের একটি প্রাডো গাড়ি ব্যবহার করছেন। ওই গাড়ির জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয়ও বাংলাদেশ বেতারের তহবিল থেকে বহন করা হচ্ছে। সরকারি যানবাহন ব্যবহারের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তারা নির্ধারিত শর্তে গাড়ি সুবিধা পেতে পারেন। তবে অন্য দপ্তরের গাড়ি ব্যক্তিগত বা অননুমোদিত কাজে ব্যবহার করলে তা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সরকারি সম্পদের ব্যবহার স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর না হলে তা দ্রুত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে। অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা জরুরি”।

ডিডিও থাকাকালে আর্থিক অনিয়ম

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রে ডিডিও (ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই সময়ে তৎকালীন এক স্টোরকিপারকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলেন, যারা আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখন কেন্দ্রের বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে অনিয়ম হয় এবং লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেতারের এক কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নের মুখে ছিল। বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব কর্মকর্তারা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত হয়ে কাজ করেছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতি করলেও থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা গত ১৮ মাসে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা এখন ভোলপাল্টে চলছেন। সরকারের উচ্চ কমিটির মাধ্যমে এসব অভিযোগ তদন্ত হলে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে”। 

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে উপসচিব পদে পদোন্নতির পর তাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এ পরিচালক পদায়ন করা হয়। তাকে অর্থ ও প্রশাসন এবং উন্নয়ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময়ে মুক্তিযুদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের কাজটা তার হাতেই হতো। এছাড়াও কিছুদিন জামুকার মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। তার পরোক্ষ ইঙ্গিতে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান করা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। 

সূত্র মতে, মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যাচাইকরণ নির্ভর প্রক্রিয়া। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, জাতীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

এরআগে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন। ওই সময় প্রতি মাসে অবৈধ মাসোহারা নিতেন। তিন বছরে এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা দুর্নীীত করে পকেটস্থ করেছেন। এছাড়া অফিসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকা, ব্যক্তিগত সুবিধামতো কর্মসূচি পরিচালনা এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্টুডিও ব্যবস্থাপনা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট

আরও অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা কেন্দ্র ও ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের স্টুডিয়ো ব্যক্তিগত রিহার্সালের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। নির্ধারিত শিল্পীরা স্টুডিয়ো না পেয়ে অনুষ্ঠান রেকর্ড করতে না পারার অভিযোগ করেছেন এমন দাবিও উঠেছে। কিছু বাদ্যযন্ত্র ব্যক্তিগত কক্ষে এনে রাখা হয়েছে।  ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠান ধারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্টুডিয়ো ব্যবস্থাপনা ও সময়সূচি রক্ষায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় অপরিহার্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কোনো ধরনের একক আধিপত্য বা অনিয়ম শিল্পীদের আস্থায় আঘাত হানে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সাধারণত ব্যক্তিগত অনিয়ম দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা সাংগঠনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে এমন মন্তব্যও করেছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়ে যায়।

তদন্তের দাবি ও প্রশাসনের ভূমিকা 

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সর্বোত্তম পদক্ষেপ হলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান পুনরুদ্ধার-দুইটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তথ্যভিত্তিক যাচাই করা জরুরি। 

সূত্র মতে, বাংলাদেশ বেতারের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন বিস্তৃত অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য উদ্ঘাটিত হতে পারে। রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং জনআস্থার প্রশ্নে বিষয়টির দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা