× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতীয় পুরস্কার নিয়ে যত কেলেঙ্কারি

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৮ এএম

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অবদান রাখলে সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সম্মানিত করার জন্য দুটো প্রধান পুরস্কার হলো স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রবর্তিত স্বাধীনতা পুরস্কার সেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়ার কথা যারা জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক মহান ভাষা আন্দোলনের ভাষা শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল দেশের বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যে। একুশে পদক প্রদানের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মুখ্য সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে; অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচন ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে মুখ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এই দুটি ক্ষেত্রেই আমলানির্ভরতার কারণে প্রদত্ত পুরস্কার ঘিরে প্রায় প্রতিবারই কেলেঙ্কারির জন্ম হয়।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত একজনকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলে বেড়াতেন যে, তার বদান্যতায়ই জনৈক বন্ধুর অখ্যাত শ্বশুর সেই পুরস্কারটি পেয়েছিল। এটা থেকেই আমলা-চরিত্রের ঔদ্ধত্য, শাসক-মানসিকতা ও ক্ষমতালিপ্সা ফুটে ওঠে। স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। সেসময় ২০১২ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য এমন একজনকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল যার উল্লেখ করার মতো কোনো অবদানই ছিল না; তার একমাত্র গুণ ছিল শেখ হাসিনা ও রেহানার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে খানস টিউটোরিয়াল নামক একটি কোচিং সেন্টার বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা।

এরপর খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম যখন চুক্তিভিত্তিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন তখন স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়ে ২০২০ ও ২০২২ সালের কেলেঙ্কারির কথা গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকেরই জানা আছে। প্রথমবার অর্থাৎ ২০২০ সালে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ঘনিষ্ঠ এক প্রাক্তন কর্মকর্তা এসএম রইসউদ্দিনকে সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের জন্য মনোনীত করার পর এর বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। ফলে সরকার বাধ্য হয়েছিল তা বাতিল করতে, যদিও খন্দকার আনোয়ার তার পদে ঠিকই বহাল ছিলেন। এরপর ২০২২ সালে আরেকটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল, যখন আমির হামজা নামক জনৈক খুনের আসামিকে সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। সেবারও পত্রিকায় লেখালেখির ফলে সরকার মনোনয়নটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল, যদিও আনোয়ার যথারীতি স্বপদে বহাল ছিলেন।

এবারকার স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনয়নপ্রাপ্ত কয়েকজনকে নিয়েও কথা উঠেছে। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে এদের নাম থাকায় কারও কারও কাছে সত্যিই বিস্ময়কর মনে হয়েছে। প্রথমেই আসা যাক প্রাক্তন সিএসপি আমলা মরহুম কাজী ফজলুর রহমান প্রসঙ্গে। জনপ্রশাসনে কোন বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন, তা একেবারেই বোধগম্য নয়; বরং তার জীবনচরিত পড়লে বোঝা যাবে দেশের পরিবর্তে নিজের ও পরিবারের উন্নয়নেই তিনি সিভিল সার্ভিস পেশাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে সেই ১৯৬৯ সালেই ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (ইপিআইডিসি) পরিচালক থাকাকালে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর তিনি তার আমলা-নেটওয়ার্কের কল্যাণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করেন এবং স্বাধীনতার পর আবার সিভিল সার্ভিসে ফিরে আসেন। তিনি জ্বালানি, পরিকল্পনা ও শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, কিন্তু জনপ্রশাসনে তার কোনো অনন্য বা গৌরবোজ্জ্বল অবদানের কথা শোনা যায় না। অবসরে যাওয়ার পর ১৯৯০-৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বা সমর্থন পেয়ে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন; কিন্তু কোনো বিশিষ্টতার ছাপ রাখতে পেরেছিলেন বলে মনে পড়ে না। তার ভাগ্নে অধ্যাপক ফকরুল আলমের মতো তিনিও আজীবন আওয়ামী ঘরানার লোক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

এবার আরেকটি যে মনোনয়ন যথাযথ হয়নি বলে মনে হয়েছে সেটা হলো চ্যানেল-আই এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের পরিচালন মুকিত মজুমদার বাবুকে পরিবেশ সংরক্ষণে অবদান রাখার জন্য মনোনীত করা। তিনি তার নিজস্ব চ্যানেলের কারণে নিয়মিত সংবাদ-কভারেজ পান, এটা সত্য, কিন্তু তাতে করে জাতীয় জীবনে পরিবেশ সুরক্ষায় কতদূর অগ্রগতি হয়েছে, সেটা একেবারেই পরিষ্কার নয়। তা ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী (জুলকারনায়েন সায়েরের ফেসবুক-পোস্ট দ্রষ্টব্য) আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার সুবাদে ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখায় তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলাও হয়েছিল।

এবার আসা যাক গিনেস বিশ্বরেকর্ডধারী ক্রীড়াবিদ জোবেরা রহমান লিনুর কথায়। তিনি গিনেস রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন ষোলোবার জাতীয় মহিলা টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণে। কিন্তু এই ব্যক্তিগত অর্জন কি জাতীয় জীবনে অবদানের কোনো মাপকাঠি হতে পারে? একটি ইভেন্টে ষোলোবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো গৌরবের পরিবর্তে দেশের টেবিল টেনিস অঙ্গনে স্থবিরতার প্রতিই ইঙ্গিত করে। তা ছাড়া দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক, এমনকি আঞ্চলিক পরিসরেও লিনুর কোনো সাফল্য নেই বললেই চলে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, লিনুর জীবনবৃত্তান্তে যে দুটি আঞ্চলিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোও সর্বৈব অসত্য। প্রথমত. তিনি দাবি করেছেন, ১৯৮০ সালে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত এশীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি পঞ্চম হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বিশ বছরে বাংলাদেশের খেলাধুলা’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা নং ২৭৫)-এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না (বাংলাদেশের কারও পুরস্কারপ্রাপ্তির কথা সেখানে বলা হয়নি)। তা ছাড়া পঞ্চম স্থানের জন্য কোনো পুরস্কারের কথা টেবিল টেনিসের ইতিহাসে কখনোই শোনা যায়নি। বিষয়টি টুর্নামেন্টটির আয়োজক টেবিল টেনিস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের নথি দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় সাফল্য হিসেবে লিনু দাবি করেছেন, ১৯৮২ সালে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম পেন্টাঙ্গুলার টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় তিনি মিশ্র দ্বৈতে রানার্সআপ হয়েছিলেন। অথচ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ইতঃপূর্বে উল্লিখিত বইটিতে (পৃষ্ঠা নং ২৭৫) এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। বরং সেখানে বলা হয়েছে, প্রথম পেন্টাঙ্গুলার টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টটি ১৯৮০ সালে (১৯৮২ সালে নয়) হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে বাংলাদেশের কেউই পদক জয় করেনি। এটার সত্যতাও টেবিল টেনিস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের নথি দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ পুরস্কারের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং-এর অনেকগুলো স্তর থাকা সত্ত্বেও মিথ্যাচারেরই জয় হয়েছে।

আর লিনুর আওয়ামীপ্রীতিও সর্বজনবিদিত; পত্রপত্রিকায় তার বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারেও এর প্রমাণ মেলে। শেখ কামালের হাত ধরেই তিনি আবাহনী ক্লাবে ঢুকেছিলেন আর পরবর্তীতে ক্লাবটির পরিচালক ও ম্যানেজার হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন। তা ছাড়া শ্রুতি আছে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী আমলে তাকে প্রায়ই সাকিব আল হাসান বা তামিম ইকবালের মতোই প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ে দেখা যেত।

এবার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো : সেই ১৯৭৭ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছরই পুরস্কার পাওয়া মরহুম ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আবারও একই পুরস্কারে ভূষিত করা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যদি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ বা দায়বদ্ধতাও থাকত তাহলে তারা এই ভুলটি করত না।

অথচ শহীদ জিয়ার মন্ত্রিসভার দুই সফল উপদেষ্টা ও মন্ত্রী ড. এম এন হুদা ও অধ্যাপক শামসুল হক এবং বেগম খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদেই অত্যন্ত সফল অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আজ পর্যন্ত স্বাধীনতা পুরস্কার (এমনকি মরণোত্তরও) পাননি।

আসলে পুরো বিষয়টির জন্যই আমলাতন্ত্র আর তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, দায়বদ্ধতার অভাব, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাববলয় নির্মাণের প্রবণতা এককভাবে দায়ী। এটা শোধরানোর জন্য সরকারকে প্রথমত আমলাতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত পৃথক জাতীয় পুরস্কার কমিশন অথবা জাতীয় পুরস্কার বাছাই কমিটি করতে হবে। দ্বিতীয়ত. প্রতিটি পুরস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকতে হবে, যেখানে ব্যক্তির লাভের চেয়েও সমাজ ও জাতির লাভটাই মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তা ছাড়া জালিয়াতি বা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিলে পুরস্কার প্রত্যাহারসহ শাস্তির ব্যবস্থা রাখাটাও বাঞ্ছনীয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা