ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৯ এএম
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৬ এএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ পঙ্ক্তিটি যেন আজজ বাস্তবতার আলো দেখেনি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ পঙ্ক্তিটি যেন আজজ বাস্তবতার আলো দেখেনি। দেশের আন্দোলন-সংগ্রামে নারীদের সরব উপস্থিতি থাকলেও পরবর্তীতে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। গত জুলাই অভ্যুত্থানেও বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পর নারীরা মূল্যায়িত হননি। সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দেখা গেছে একই দৃশ্য। নির্বাচনে প্রার্থিতায় মাত্র ৪ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনীতিতে ঢাল হিসেবে নারীদের ব্যবহার করা হলেও তাদেরকে ক্ষমতার মসনদে রাখা হয় না। ফলে মাঠের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও তাদের প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮৪ জন, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশ। এদের মাঝে দলীয় প্রার্থী ছিলেন ৬৬ জন। তাদের মাঝেÑ বিএনপির ১০, জাতীয় পার্টির ৬, এনসিপির ২, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) ১০, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৬, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৫, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ৬, গণসংহতি আন্দোলনের ৪, গণফোরামের ৩, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ৩, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ১, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ১, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ১, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ১, নাগরিক ঐক্যের ১, আম জনতার দলের ১, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ১ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ১ জন প্রার্থী। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ১৯ জন। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো নারীকে প্রার্থী করেনি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীদের মাঝে মাত্র ৭ জন নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
এদিকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের যে মন্ত্রিসভা গঠন হয়েছে, সেখানে নারীদের মাঝে একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলে কোনো নারী সংসদ সদস্যই নেই।
দেশে নারী নেতৃত্বের এই অবস্থায় আজ ৮ মার্চ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্যÑ ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।
‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সরকার শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও রাজনীতিসহ সকল স্তরে নারীর সক্রিয় ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সকল নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। নারীদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন। শহীদ জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে ‘নারী বিষয়ক দপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৮ সালে গঠন করা হয় ‘মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ যা পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১৯৯৪ সালে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এ রূপান্তরিত হয়।’
প্রধানমন্ত্রী ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন।
কর্মসূচি
দিবসটি উপলক্ষে আজ রবিবার সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা নানান কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক অদম্য নারী পুরস্কার প্রদান, আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রাসহ বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান অন্যতম।
তা ছাড়া অদম্য নারী পুরস্কারের আওতায় বিশেষ অবদান রাখা নারীদের স্বীকৃতি প্রদান, দেশজুড়ে নারী অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
ক্ষমতার মসনদে কতটা স্থান পাচ্ছে নারী
ক্ষমতায় যাবার পথ তৈরিতে প্রাচীনকাল থেকে নানাভাবে নারীদের ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের সামনে রাখা হয়েছে যেন পুরুষরা কম আক্রান্ত হয়। নারী সংসার সামলানোর পাশাপাশি রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলাতে বড় সহায়ক হলেও তাদের ভাগ্যে ক্ষমতার শিকে ছিঁড়েছে খুব কম সময়েই।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি নেত্রী নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘নারীকে মিছিল-মিটিংয়ে সামনে রাখা হয়। এই সামনে রাখা কখনও কখনও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মূল্যায়ন হয় না। আর যেসব নারী সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পান, সেখানেও পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে পুরুষ না থাকায় তাদের সামনে আনা হয়।’ রাজনীতিতে নারীর স্থান মসৃণ নয় বলেই তিনি মন্তব্য করেন।
কূটনীতি ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে নারী নেতৃবৃন্দ : নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ‘নারীর ক্ষমতায়ন দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দলের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে’ উল্লেখ করে বলেন, ‘কূটনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক সেবায় নারীর অধিকতর সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, ‘অনেক নারী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আমাদের মিশনগুলোতে কাজ করছেন। এই অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে, যাতে তারা পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন।’
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছু রাজনৈতিক দল নারীদের প্রচার-প্রচারণায় সম্পৃক্ত করলেও প্রার্থী হিসেবে তাদের মনোনয়ন দেয় না।’
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ‘গৃহস্থালি কাজে নারীরা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, তা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এতদিন তা অস্বীকৃত ছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নারীর এই অদৃশ্য শ্রমের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি দিতে কাজ শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘প্যাসিভ ওয়েতে যারা ঘরে কাজ করছেন, তারা আমাদের জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ অবদান রাখছেন। এই নারীরা ঘরে কাজ না করলে আমরা বাইরে কাজ করতে পারতাম না।’
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যেখানে আমাদের অস্তিত্বের সংকট সেখানে কেবল ‘ভালো মেয়ের’ ইমেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরাজয়ের নামান্তর। রাষ্ট্র ও সমাজ বদলাবে, কিন্তু তার আগে পরিবারের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে কোনো নারী নিজ ঘরে বৈষম্যের শিকার না হন।’
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নারীর ক্ষমতায়ন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে অ্যাকশনএইড তাদের মূল্যায়নে বলেছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র ৩.৯৩ শতাংশ। এটি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি সতর্কবার্তা।’ সংস্থাটি বলছে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় কাঠামোগত বাধা, ক্রমবর্ধমান জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রুদ্ধ করছে।
অ্যাকইশনএইড আরও জানায়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সকল স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এখন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক অপরিহার্যতা। এ ব্যাপারে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমরা শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে চাই না, একটি প্রভাবশালী পরিবর্তন চাই।’
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ভোটার হিসেবে নারী গুরুত্বপূর্ণ হলে নেতৃত্বে তাদের সমস্যা কোথায়? আমরা নারীকে এখনও যোগ্য মর্যাদার আসনে বসাতে পারিনি। আমরা চাই জনগণের প্রতিনিধি হয়ে নারী ও পুরুষ উভয়েই যেন নারীর অধিকারের কথা বলেন।’
মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবির বলেন, ‘সংসদে ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এটি প্রমাণ করে রাজনৈতিক দলগুলো নারী নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বাখতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘সংসদে নারীদের যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে, তা মূলত নারীদের মূলধারার রাজনীতি থেকে পিছিয়ে রাখারই একটি কৌশল।’
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট
দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন ছিল। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে নারী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে হয় দ্বিতীয় সম্মেলন। সেখানে ক্লারা প্রতিবছরের ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দিলে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিশ্বের অনেকে দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হতে থাকে। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।