কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:১০ এএম
আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৩ এএম
পাম্পে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকটে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রাইভেট গাড়ি ও মোটরবাইকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের কয়েক দফা তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। সাধারণত দাম বৃদ্ধির খবর ছড়ালে এমন দৃশ্য লক্ষ করা যেত। ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তেলের দাম বাড়তে পারে এমন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক চালক আগাম প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করেছেন।
শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। দুপুর থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত লাইন আরও দীর্ঘ হতে থাকে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন। আগে যেখানে অধিকাংশ চালক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল নিতেন, সেখানে এখন অনেকেই এক হাজার টাকা বা তারও বেশি মূল্যের তেল নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ট্যাংক পুরোপুরি ভর্তি করছেন, যাতে সম্ভাব্য সংকটের সময় গাড়ি চালাতে সমস্যা না হয়।
পাম্প মালিকরা অভিযোগ করেছেন, চাহিদার তুলনায় তেল সরবরাহ কম পাওয়া যাচ্ছে। একটি পাম্পে যেখানে তিনটি ট্যাংকারে প্রায় ২৭ হাজার লিটার তেল পাওয়ার কথা, সেখানে আসছে মাত্র প্রায় ১৮ হাজার লিটার। ফলে তেল দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক চালক তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কুড়িল এলাকার পিমাক্যাল পাওয়ার লিমিটেড পেট্রোল পাম্পের অপারেটর নাজমুল হেলাল জানান, তাদের ট্যাংকের ধারণক্ষমতা প্রায় ১৫ হাজার লিটার, তাই বেশি তেল মজুদ রাখা সম্ভব নয়। তবে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি এমন যে, তিন দিনের তেল এক দিনেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১৭ হাজার লিটার বা তারও বেশি তেল বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাধারণত দিনে দুটি ট্যাংকার তেল আসে। কিন্তু চাহিদা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সেই সরবরাহও যথেষ্ট হচ্ছে না। অনেক চালক একাধিকবার এসে তেল নিচ্ছেন। একজন বাইকচালককে দেখা গেছে, তিনি ১৪ লিটার করে কয়েকবার তেল নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের চিন্তায় তেল জমিয়ে রাখছেন।
রাইড শেয়ারিং সেবা ‘পাঠাও’-এর চালক গিয়াসউদ্দিন জানান, তেল পেতে তাকে কয়েকটি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। তিনি বলেন, সকাল থেকে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেছি। কোথাও তেল নেই, কোথাও আবার লাইনের দৈর্ঘ্য এত বড় যে দাঁড়ানোই কঠিন। শেষ পর্যন্ত কুড়িল থেকে তেল পেয়েছি। প্রায় ৫০ জনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। গাড়ি চালিয়েই সংসার চলে, তাই তেল না পেলে বিপদে পড়তে হয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালক নাইমুর রহমান। তিনি বলেন, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ির লাইন যেন শেষই হচ্ছে না। অনেকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ তেল নিচ্ছেন। শুনেছি আমদানির জাহাজ আটকে আছে। তাই সুযোগ পেয়ে ট্যাংক ভর্তি করছি।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাইজুল হোসাইন বলেন, অফিসে যাতায়াতের জন্য তার মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা। তিনি জানান, কয়েকটি পাম্পে ঘুরেও তেল পাননি। কোথাও তেল শেষ হয়ে গেছে, কোথাও আবার লাইন অনেক বড়। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ট্যাংক ভর্তি করেছেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি সংকট হয়, অন্তত কয়েক দিন যেন সমস্যা না হয় সেই চিন্তা থেকেই ট্যাংক পূর্ণ করেছি।
এস টি পাওয়ার লিমিটেডের কর্মচারী রাশেদ নূর বলছেন, হঠাৎ তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পেছনে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে ধারণা করছেন, সামনে তেলের সংকট হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই তারা আগাম তেল কিনে রাখছেন। তবে এর ফলে স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়ছে।
একই পাম্পে তেল নিতে আসা ইউনুস মিয়া বলেন, কি করমু ভাই, যদি তেল না থাকে কীভাবে রাস্তায় বের হব। এই গাড়ির ওপর যে পরিবারের ভরণপোষণ। না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই আজ অতিরিক্ত ১০ লিটার তেল নিলাম। কালও মজুদ রাখব, যাতে সংকট হলে কয়েক দিন চলতে পারি। তিনি আরও বলেন, পাম্পগুলোও অতিরিক্ত তেল দিতে চায় না।
পাম্প মালিক ও সরবরাহকারীরা বলছেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় হঠাৎ করেই তেলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেক চালক একাধিকবার এসে তেল নিচ্ছেন। কেউ কেউ বাইক বা গাড়ির পাশাপাশি অতিরিক্ত পাত্রেও তেল নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকটের আশঙ্কায় চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। গতকাল শুক্রবার নগরের বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখা গেছে। কিউ সি ট্রেডিং ফিলিং স্টেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের স্টকে পর্যাপ্ত তেল আছে। তেলের সংকটের আশঙ্কা থেকে মানুষ হঠাৎ বেশি করে তেল কিনতে এসেছে।
খুলনা
খুলনায় তেলের ঘাটতি না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তেলের সংকটের খবর শুনে বাড়তি তেল সংগ্রহ করতে পাম্পে এসেছেন।
সিলেট
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে পারেÑ এমন আশঙ্কায় সিলেটের পাম্পগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া লাইন শুক্রবারও অব্যাহত ছিল। পাম্পমালিকরা জানিয়েছেন, আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর নেই এবং সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে মোটরসাইকেল প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
রাজবাড়ী
হঠাৎ তেলের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে পাম্পগুলোতে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, ডিপোতে তেল না থাকার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো পাম্পে মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ৫০০ টাকা এবং কৃষকদের ১০ লিটারের বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না।
নাটোরের বড়াইগ্রাম
সকল পাম্পে মোটরসাইকেল প্রতি ১০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। পাম্পমালিকরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের তেল মজুদের স্বল্পতা ও সম্ভাব্য সংকটকে মাথায় রেখে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন, কিছু পাম্প কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ব্যবসা করছে।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
ভৈরবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানচালকদের সর্বোচ্চ ১০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় চালকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। পাম্পমালিক আব্দুল মন্নান জানিয়েছেন, সকাল থেকে তেল সরবরাহ করা হলেও বিকাল ৪টার পর পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, সংকটের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
প্রতিবেনটি তৈরিতে তথ্যসহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম অফিস, খুলনা অফিস, সিলেট, রাজবাড়ী, বড়াইগ্রাম (নাটোর) ও ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) প্রতিবেদক