মাসুদ রানা
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১৪:১৫ পিএম
১৯৭১ সালের ৬ মার্চ দিনটি ছিল শনিবার। জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দেন। ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনীয় সৈন্য ও অস্ত্র আনার জন্য এই ঘোষণা দেয়। মূল কারণ ছিল তার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের জন্য সময় প্রয়োজন ছিল।
ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ জেনারেল টিক্কা
খানকে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর নিযুক্ত করে। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের এই পরিস্থিতির
জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে দায়ী করে।
ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে বলেন, ‘আমি
পরিষ্কার বলে দিতে চাই যে, পরে কী ঘটবে তাতে কিছু যায়-আসে না। পাকিস্তানের সশস্ত্র
বাহিনী যতদিন আমার কমান্ডে আছে এবং যতদিন আমি রাষ্ট্রপ্রধান আছি ততদিন আমি পাকিস্তানের
পূর্ণ সংহতি বজায় রাখব। পাকিস্তান রক্ষা করার দায়িত্ব আমার কাছে আছে।’
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ শাসনতন্ত্র রচনার উপযোগী ছিল না। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের
বিপুল সংখ্যায় প্রতিনিধি ৩ মার্চ তারিখে অধিবেশনে যোগদান করতে অসম্মতি জানান।’
আলোচনার আড়ালে ইয়াহিয়া খান পূর্ব
পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। বেসামরিক পোশাকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে
সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে। তাছাড়া নগদ টাকাসহ সিনিয়র আর্মি অফিসারদের পরিবার;
বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তাদের পরিবারকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া
হয়।
৬ মার্চ পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে
যায় যে, জেলে থাকা কয়েদিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে ৩৪১ জন
কয়েদি পালিয়ে যায়। পরে ১৬ জন কয়েদি ধরা পড়ে। কয়েদিরা জেলের গেট ভেঙে পালানোর সময় নিরাপত্তা
বাহিনীর গুলিতে ৭ জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ৩০ জন।
বাংলার শিল্পী সমাজ গণহত্যার প্রতিবাদ
করে। তারা বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে শপথ গ্রহণ করে। সন্ধ্যা
৬টায় পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্ররা একটি মশাল মিছিল নিয়ে বায়তুল মোকাররম থেকে যাত্রা শুরু
করে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন পথ অতিক্রম করে। মিছিলের সময় ছাত্রনেতারা সর্বসাধারণকে স্বাধীনতার
আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান। ‘পরিষদে লাথি মার, বাংলাদেশ মুক্ত কর; আপস প্রস্তাবে
লাথি মার, স্বাধিকার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়’ বলে স্লোগান দিতে থাকে।
এই দিন খুলনায় পূর্ণ হরতাল পালিত
হয়। খালিশপুরের শ্রমিক জনতা মিছিল নিয়ে খুলনার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে, ফুলবাড়ি
থেকে দৌলতপুর অগ্রসর হওয়ার সময় ৫টি ট্রাক ও ৩২টি জিপ শান্তিপূর্ণ মিছিলের কাছ দিয়ে
গিয়ে দৌলতপুর ডাকঘরের সামনের সড়কের ব্যারিকেড সরাতে গেলে উত্তেজিত জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ
হয়। তখন পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ করে। পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ৫ জন নিহত হয়।
৭ মার্চের ইত্তেফাক পত্রিকায় খুলনার
৬ মার্চের দাঙ্গা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘খুলনার বিভিন্ন স্থানে গতকাল দাঙ্গা-হাঙ্গামা
এবং গুলিবর্ষণে ৫০-৬০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে।’
রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃপক্ষ
একটি প্রেসনোটে বলে, ‘গত ৩ ও ৪ মার্চ যশোর, খুলনা ও রাজশাহী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে একদল
উচ্ছৃঙ্খল জনতা আক্রমণ করলে সেনাবাহিনী গুলি করতে বাধ্য হয়। ফলে ৮ জন ব্যক্তি নিহত
ও ১৮ জন আহত হয়।’
ইয়াহিয়া খানের ভাষণের পরে আতাউর রহমান
খানের নেতৃত্বে জাতীয় লীগ; মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ন্যাপ; অলি আহাদ; শ্রমিক নেতা কাজী
জাফর আহমদ পৃথক পৃথকভাবে সমাবেশ করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান করেন।
পরিস্থিতির চাপে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে
পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে নেতাকর্মীদের মেসেজ দেওয়া হয়,
‘৭ মার্চ যেন কোনোভাবেই জনগণকে উস্কানি না দেওয়া হয়।’ ৭ মার্চের জনসভাকে কেন্দ্র করে
আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ রেসকোর্স ময়দানে কামান বসানো হয়।