বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১৭:৩২ পিএম
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপের প্রেক্ষাপটে সরকারি দপ্তরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
বৃহস্পতিবার জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও কর্পোরেশনসহ সব দপ্তরে বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ অধিশাখা থেকে জারি করা স্মারকে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অফিস পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের সাশ্রয়মূলক ব্যবস্থা অবিলম্বে কার্যকর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব:
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা গত কয়েক বছরে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের দৃষ্টিতেও জ্বালানি সাশ্রয়কে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের একজন বিশ্লেষক বলেন, 'বিদ্যুৎ উৎপাদন যতই বাড়ানো হোক, ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করলে চাপ কমানো কঠিন। তাই সরকারি অফিসগুলো থেকে সাশ্রয়ের সংস্কৃতি শুরু করা একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।'
সরকারি অফিসে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় সরকারি অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বেশ কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানালা ও দরজা খোলা রেখে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া অফিসে বর্তমানে ব্যবহৃত আলোর অর্ধেক ব্যবহার করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত বাতি জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অফিস চলাকালীন অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান ও এয়ার কন্ডিশনার বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করলে তাপমাত্রা অন্তত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অফিস কক্ষ ত্যাগ করার সময় বাতি, ফ্যান, এসিসহ সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ করতে হবে। করিডোর, সিঁড়ি ও ওয়াশরুমের মতো স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাতি জ্বালানো বন্ধ রাখতেও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া অফিস সময় শেষে সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র-যেমন কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, লাইট ও ফ্যান-বন্ধ রাখা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলোকসজ্জা ও গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ:
নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহারের কথা বলা হয়েছে। সরকারি ভবনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত আলো ব্যবহারের প্রবণতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি গাড়ির ব্যবহার সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে গাড়ি ব্যবহারে সংযমী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশই গ্যাস, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
বাস্তবায়নে দপ্তরগুলোকে নির্দেশ:
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে বলা হয়েছে, উল্লিখিত নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে।
এর মাধ্যমে সরকারি অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে একটি সাশ্রয়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি দপ্তরে এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা কমাতেও এটি কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।