কবির হোসেন
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৮ এএম
চাঁদাবাজি। প্রতীকী ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় বিএনপির প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে চাঁদাবাজি রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ সময় ভোটাররাও প্রার্থীদের বলেছিলেন, যদি বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে, তবে প্রথমে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও চাঁদাবাজি রোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে যত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ রয়েছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। শিগগিরই তালিকা অনুযায়ী সমন্বিত অভিযান শুরু করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সম্প্রতি চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন এমপি-মন্ত্রীরাও। তারা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা কোনোভাবেই চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেবেন না। তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল মুখের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হবে না। তারা বলছেন, বিগত সময় এমন মৌখিক প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলো থেকে বহুবার শোনা গেলেও বাস্তবে তার ফলাফল বিপরীত হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা চাঁদাবাজি করে তাদের একটি রাজনৈতিক আশ্রয় বা প্রশ্রয় থাকে। এটি তাদের টিকে থাকার শক্তি বা রহস্য। তবে সরকার চাইলে যেকোনো ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব। নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সরকার তা এখন কীভাবে বাস্তবায়ন করছে, আমরা সেটাই দেখতে চাই।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা (প্রায় আড়াই হাজার) প্রস্তুত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই তালিকা অনুযায়ী দ্রুত কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যা শিগগিরই শুরু হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যমতে, রাজধানীতে আড়াই হাজারের বেশি চিহ্নিত চাঁদাবাজ রয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলার সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও চাঁদাবাজদের হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করেছে। সেই তালিকায় প্রতিটি জেলায় এক হাজারের বেশি চিহ্নিত চাঁদাবাজ রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্ধলক্ষাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ যাচাই করছে পুলিশ, যাদের মধ্যে বেশিরভাগ নতুন। পুলিশ সদর দপ্তর ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের সদর দপ্তর পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আর এই লক্ষ্য অর্জনে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের চিহ্নিত চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। দ্বিতীয়ত, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দাগি আসামিদের একটি নিরপেক্ষ ও সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুলিশকে ‘নির্মোহ’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জনগণের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সহযোগিতারও আহ্বান জানান।
এদিকে এবার পবিত্র রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি রোধে ব্যাপক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফুটপাতকে চাঁদামুক্ত রাখতে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই চাঁদাবাজি ঠেকাতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এবং প্রত্যেক থানার ওসিকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি, সাদা পোশাকে টিম মোতায়েন এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং মাদকদ্রব্য রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও মহাসড়কে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।