তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ০০:০৯ এএম
প্রতীকী ছবি।
নতুন নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সারা দেশে সংঘটিত পুলিশ হত্যা মামলার তদন্ত। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ৪৪ জন পুলিশ হত্যা মামলা গত ১৮ মাস ধরে কার্যত ফাইলবন্দি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব হত্যা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি। রাজনৈতিক অঙ্গন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে পুলিশ হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরেও এসব মামলার ফাইল নড়াচড়া শুরু হয়েছে।
মাঠ পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, এসব মামলা তদন্তে ইতোমধ্যে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ও মিলেছে। দ্রুতই শুরু হচ্ছে মামলার তদন্ত কার্যক্রম। এরই মধ্যে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট কাজ শুরু করেছে। সেখানে ২০ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ ও সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরসহ পৃথক ৪ হামলায় অন্তত ১৮ পুলিশ সদস্য হত্যার আসামিদের চিহ্নিত করা গেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। গত দেড় বছরেও সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ঘটনায় মামলা না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে, পুলিশ হত্যা ও থানায় হামলার তদন্ত হবেই। ‘ক্রিমিনাল ইভেন্ট কখনও তামাদি হয় না’Ñ এমন বার্তাই গেছে মাঠপর্যায়ে। একাধিক টিম ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছে। হামলার আগে-পরের ভিডিও ফুটেজ, আলামত, কল রেকর্ড, ভয়েস রেকর্ড সবই প্রস্তুত রয়েছে। কিছু আলামত নষ্ট হলেও অধিকাংশ প্রমাণ রয়েছে পিবিআই, সিআইডি, ডিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। এ ধরনের খবর প্রচারের পর একটি মহলে অবশ্য অস্থিরতা বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সর্বপ্রথম যাত্রাবাড়ী থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ডে ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই (নিরস্ত্র) মো. মোক্তাদিরকে হত্যা করে ফুটওভার ব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা হয়। একই দিন ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের নায়েক মো. গিয়াস উদ্দিনকেও একই এলাকায় হত্যা করা হয়। ২১ জুলাই বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় হত্যা করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়াকে। তিন হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সেসময় সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর পর ৫ আগস্ট উত্তরা পূর্ব থানার সামনে হত্যা করা হয় ডিবি উত্তরের ইন্সপেক্টর রাশেদুল ইসলাম, এসআই খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার, ট্রাফিক কনস্টেবল মো. শাহিদুল আলম, কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগের মো. আবু হাসনাত রনি ও পিওএম দক্ষিণের কনস্টেবল মো. সুজন মিয়াকে।
একই দিন যাত্রাবাড়ী থানা ঘিরে অগ্নিসংযোগের সময় পিটিয়ে হত্যা করা হয় এসআই (নিরস্ত্র) শ্রী সুজন চন্দ্র দে, এএসআই (নিরস্ত্র) সঞ্জয় কুমার দাস, কনস্টেবল মো. আব্দুল মজিদ, মো. রেজাউল করিম, কদমতলী থানা থেকে আসা এএসআই (নিরস্ত্র) ফিরোজ হোসেন ও কনস্টেবল মীর মোনতাজ আলীকে। ওইদিনই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় হত্যা করা হয় পিওএম পশ্চিমের কনস্টেবল মো. মাহফুজুর রহমানকেও। ১৪ আগস্ট শ্যামপুর থানা এলাকায় কনস্টেবল মো. খলিলুর রহমানকে মারধর করা হয়; পরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ঢাকার বাইরে দেশজুড়ে টার্গেটেড হামলা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গাজীপুরের বাসন থানার সামনে কনস্টেবল মোহাম্মদ আব্দুল মালেক নিহত হন। আশুলিয়ায় হত্যা করা হয় এএসআই (নিরস্ত্র) মো. সোহেল রানা, রাজু আহম্মেদ এবং এসবির এএসআই (নিরস্ত্র) মো. রফিকুল ইসলামকে। কুমিল্লার তিতাস থানা কম্পাউন্ডে এসআই (নিরস্ত্র) রেজাউল করিম ও কনস্টেবল মাইনুদ্দিন লিটনকে পিটিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ আগস্ট ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানায় ঢুকে হত্যা করা হয় কনস্টেবল মো. এরশাদ আলীকে। চাঁদপুরের কচুয়া থানাধীন সরকারি কলেজ মাঠে নিহত হন এসআই (নিরস্ত্র) মো. মামুনুর রশীদ সরকার। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানা প্রাঙ্গণে নিহত হন এসআই (নিরস্ত্র) মো. বাছির উদ্দিন ও কনস্টেবল মোহাম্মদ ইব্রাহীম। হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানায় ঢুকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় এসআই (নিরস্ত্র) সন্তোষ চৌধুরীকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানায় এটিএসআই আলী হোসেন চৌধুরীকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২ আগস্ট খুলনার লবণচড়া থানাধীন গল্লামারী বাজারে নিহত হন কনস্টেবল সুমন কুমার ঘরামী।
ঢাকার বাইরে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী কনস্টেবলসহ ১৫ জনকে হত্যা করা হয় ওই থানায়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় থানা। ৪ ও ৫ আগস্ট দুই দিন এনায়েতপুর থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ৪ আগস্ট থানার পাশে বাবু মিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় থানার ওসি মো. আব্দুর রাজ্জাক, এসআই মো. রইস উদ্দিন খাঁন, এসআই প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস, এসআই আনিসুর রহমান মোল্যা, কনস্টেবল মো. আব্দুস সালেক, মো. হুমায়ুন কবির, মো. রিয়াজুল ইসলাম ও মো. হানিফ আলীকে। এসআই মো. তহেছনুজ্জামান, এসআই মো. নাজমুল হোসাইন, এএসআই মো. ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল মো. হাফিজুল ইসলাম, মো. রবিউল আলম শাহ, মো. আরিফুল আযম ও মো. শাহিন উদ্দিনকে হত্যা করা হয় থানা কম্পাউন্ডে। ওই ঘটনায় ২৭ আগস্ট আওয়ামী লীগের ৪ নেতাসহ ৬ হাজার জনকে আসামি করে মামলা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, মামলাটিতে প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করা হয়েছে। বর্তমান ওসি জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, এরপর ওই ঘটনায় পৃথক চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বৈষম্যবিরোধী ও অন্যটি পুলিশ হত্যা মামলা। এসব মামলার তদন্ত এখনও চলছে।
১৮ পুলিশ সদস্য খুনের আসামি চিহ্নিত : অধিকাংশ থানার বর্তমান ওসিরা জানিয়েছেন, ঘটনার পর তারা থানায় কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন; তবে মামলা হয়েছে কি না জানেন না। তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তারা এ-ও বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল না। যে কারণে তারা এসব মামলার বিষয়ে অবগত নন। যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র বলছে, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষ্য, কল ডেটাসহ ডিজিটাল প্রমাণ সবই প্রস্তুত রয়েছে।
সূত্রমতে, ৫ আগস্টের আগের ৪টি হত্যাকাণ্ডের একটি ঘটে ২১ জুলাই। ওই দিন বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় হত্যা করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়াকে। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। পিবিআইয়ের সূত্র জানায়, ঘটনার দিন ওই পুলিশ কর্মকর্তা ওষুধ কিনতে বাসার নিচে নামেন। ওই সময় বাসার নিচে থাকা লোকজন তাকে চিনে ফেলায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তদন্ত করা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে হত্যাকারীরা চিহ্নিতও হয়েছেন। ঘটনা ভিডিও ফুটেজসহ তদন্তে সহায়ক সব ধরনের প্রমাণও পিবিআইয়ের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত পেলেই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।
চিহ্নিত আসামিরা একটি রাজনৈতিক দল ও একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য বলেও জানা গেছে। এদের কয়েকজন অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলে রয়েছেন। সিগন্যাল পেলেই তাদের পুলিশ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে।
এদিকে যাত্রাবাড়ীতে ২০ জুলাই হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই পুলিশ সদস্যের খুনিরাও চিহ্নিত হয়েছে। এনায়েতপুর থানায় হামলাকারীরাও পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরছে। তবে পুলিশ হত্যা মামলার তদন্ত আবারও শুরু হওয়ার ঘোষণায় তারা খানিকটা অস্বস্তিতে রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০ ও ২১ জুলাই এবং ৪ আগস্টের পৃথক ৪টি হামলায় ১৮ পুলিশ সদস্য খুনের আসামিরা এখন পুলিশের কাছে চিহ্নিত। ঘটনাগুলো রাজধানীর রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ ও সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ঘটে বলে পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁও শহরের হাজীপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার নতুন ভবন উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করা হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যা বলেছেন, সরকার সে পথেই হাঁটবে। অন্যদিকে একই দিন এক বিবৃতি দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, সুরক্ষা অধ্যাদেশ উপেক্ষা করে পুলিশ হত্যা তদন্তের নামে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন খাতে প্রবাহের অপচেষ্টা চলছে।