মাসুদ রানা
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৫:৪৭ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৫:৫০ পিএম
১৯৭১ সালের মার্চ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাস। বাঙালির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মাস। অগ্নিঝরা মার্চের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত মুক্তিকামী বাঙালির স্বপ্ন আর আবেগের গল্প। মার্চের শুরু থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ স্লোগান তোলে, ‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।
১ মার্চ ১৯৭১, সোমবার। দুপুর ১.০৫
মি. প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন
অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি বলেন, পাকিস্তান চরম রাজনৈতিক
সংকটে রয়েছে, আর পরিস্থিতি জটিল করার জন্য ভারত দায়ী।
ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা শোনার পর পূর্ব
পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রী দলে
দলে ক্লাস থেকে, হল থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জড়ো হতে থাকেন। বটতলা
থেকে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলটি শহীদ মিনার, মেডিকেল কলেজ, হাইকোর্ট হয়ে মতিঝিল বাণিজ্যিক
এলাকায় অবস্থিত পূর্বাণী হোটেলের সামনে সমবেত হয়।
ডাকসু নেতারা বিকালে পল্টন ময়দানে
প্রতিবাদ সভা করবেন বলে ঠিক করেন। স্বতঃস্ফূর্ত বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে।
সভা শেষে ছাত্র-জনতা নওয়াবপুর ও বাহাদুরশাহ পার্ক হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ
করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিলে স্লোগান ছিলÑ ‘ভূট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ কায়েম
কর।’
গুলিস্তানের এক পথসভায় তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আর কোনো দল নয়, কোনো মত নয়, নেই
কোনো ভেদাভেদ। শেখ সাহেব আপনার কাছে আমাদের আবেদনÑ আপনি সিদ্ধান্ত নিন। বাংলার প্রতিটি
মানুষ আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে হবে।’
শেখ মুজিবুর রহমান ১ মার্চ বিকালে
হোটেল পূর্বাণীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ২
মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ সারা প্রদেশে হরতাল ডাকেন। তিনি ৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভা
অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করে বলেন, ‘৭ মার্চের জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচির রূপরেখা দেওয়া
হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।’
১ মার্চ পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল
বোর্ড ও কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা চলছিল, রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের
ঘোষণা শোনা মাত্রই স্টেডিয়ামের দর্শকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি
বেগতিক দেখে ম্যাচটি বন্ধ করতে হয়। পরের দিনের দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবরের শিরোনাম
ছিল, ‘জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে দর্শকগণ কর্তৃক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট
ম্যাচ পণ্ড।’
ঢাকা শহর পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে।
বন্ধ হয়ে যায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, কলকারখানা, দোকানপাট, যানবাহন
সব। আন্দোলন শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, মহাকুমা
ও শহরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে।
ফরিদপুর :
ইয়াহিয়ার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে শহরের ছাত্র-জনতা মিছিল করেন। মিছিল
শেষে অম্বিকা ময়দানে সমাবেশ করেন। সমাবেশে ফরিদপুরে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
গঠন করা হয়।
রাজশাহী :
ইয়াহিয়ার ভাষণের প্রতিবাদে রাজশাহী কলেজে একটি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ছাত্ররা
মিছিলে বের হন। মিছিলকারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে উড্ডীয়মান পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে
সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। এমনকি রেডিও স্টেশন, ডিসি অফিস ও জেলা জজ অফিস হতেও পাকিস্তানের
পতাকা নামানো হয়। জজ কোর্টের পতাকাটি নামান রাজশাহী কলেজের ছাত্র সাব্বির আহমেদ মতি।
মিছিলকারীরা রাজশাহীর বর্ণালী সিনেমা হলে উর্দু ছবি ‘রোড টু সোয়াত’ প্রদর্শনী বন্ধ
করে দেয়। বিকালে ভুবন মোহন পার্কে একটি জনসভায় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের পরিবর্তে
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়। ২ মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত
নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতা ১ মার্চ থেকে ধর্মঘট
শুরু করেন। মিছিল আর মিটিংয়ে চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন এলাকা একাকার হয়ে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের
সাধারণ সম্পাদক আবদুর রবের নেতৃত্বে শিক্ষক, কর্মচারী ও ছাত্ররা কয়েক দফায় বৈঠকে বসেন।
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মৌলভী সৈয়দসহ অন্যদের নিয়ে চট্টগ্রাম রাইফেলস ক্লাবের পাশে
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে পরের দিন ২ মার্চের
হরতাল এবং লালদীঘি ময়দানে জনসভার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
খুলনা : ১ মার্চ খুলনার সকল কলেজে বিএ অনার্স প্রথম
দিনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। পরীক্ষা শেষে ছাত্ররা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের
খবর শুনে বিএল কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি স ম বাবর আলীর নেতৃত্বে ছাত্ররা দলে দলে কলেজ
থেকে মিছিল করতে করতে শহরে আসেন। শিক্ষক, আইনজীবী, শ্রমিক-কর্মচারী সকলে রাস্তায় নেমে
আসেন। খুলনা শহর পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে।
সিলেট : জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা শোনার
সাথে সাথে তাৎক্ষণিক সিলেটের ছাত্র-জনতা বিক্ষোপ মিছিল বের করেন।
ময়মনসিংহ : ১ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়
প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল ময়দানে বিকাল সাড়ে ৪টায় এক জনসভা অনুষ্ঠিত
হয়। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিল ও সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের হয়।
সন্ধ্যায় গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল
এসএম আহসানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সামরিক প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে
গভর্নরের বেসামরিক প্রশাসনের সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংবাদপত্রে দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে
কোনো খবর প্রকাশ করা যাবে না বলে নতুন আদেশ জারি করা হয়।