আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩১ এএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৬ এএম
জাতীয় সংসদ। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি জামায়াতকে দেওয়ায় খুশি হতে পারেননি বিএনপির সংসদ সদস্যরা। জোটসঙ্গীসহ বিএনপির অনেক সংসদ সদস্য ডেপুটি স্পিকার হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। তাদের মন ভেঙেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষণায়। তিনি জানিয়েছেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদটি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’ এ ঘোষণার পর বিএনপির পদবঞ্চিতরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হওয়ার পরে ডেপুটি স্পিকারের দুটি পদ হতো। তখন এমনিতেই বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকারের একটি পদ পেত। আগাম পদ বিতরণ করে দলীয় লোকদের বঞ্চিত করা হলো।
এদিকে চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ এবং আরও ৬ সংসদ সদস্যকে জাতীয় সংসদের হুইপ নিযুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সোমবার সংসদ সচিবালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা। প্রসঙ্গত, চিফ হুইপ সরকারের পূর্ণমন্ত্রী ও হুইপগণ প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদ জামায়াতকে দেওয়া এবং চিফ হুইপ ও হুইপ নিযুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তে দলের ভেতরে পদবঞ্চিত অনেক নেতাই সোমবার ফোন বন্ধ রাখেন। তাদের অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, ফোন সুইচ বন্ধ করে রাখার বার্তা আসে। এর মাঝে সন্ধ্যায় পদ প্রত্যাশা করে বঞ্চিত কয়েকজন জানান, ‘এতদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম, অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তার কোনো মূল্যায়ন হলো না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সংসদ সদস্য বললেন, ‘আমার জন্য নেতাকে বলার মতো কেউ নেই।’
এদিকে সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেটা আমরা সমঝোতায় এসেছি, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সেটার বাস্তবায়ন এখন থেকেই শুরু করতে চাই।’
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা প্রধান বিরোধী দলকে মৌখিকভাবে ও সাক্ষাতে অফার করেছি, তারা যেন ডেপুটি স্পিকার ঠিক করে। সেটা জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে নির্বাচিত হতে পারে।’
উল্লেখ্য, সরকারি দল হিসেবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটোই নিতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদের যে সমঝোতা করা হয়েছে সেখানে দুটি ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃজন হবে তার মধ্যে বিরোধী দল একটি পদ পাবে।
সরকারি দল বিএনপি ও তার জোট সঙ্গীদের আপত্তি এখানেই। তারা বলছেন, যেটা জুলাই জাতীয় সনদের পরে করা যেত সেটা এখনই কেন দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির এই উদার রাজনীতির কোনো মূল্য জামায়াতের কাছে নেই। নির্বাচনের আগে তাদের আচরণ, প্রচার-প্রচারণায় এটা স্পষ্ট ছিল। তারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদের সবকিছু সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সে সময়ে জামায়াতের আসল চেহারা স্পষ্ট হবে।
চিফ হুইপ ও হুইপ হলেন যারা
চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নিযুক্ত হয়েছেন। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান। নূরুল ইসলাম মনি ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বরগুনা-২ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
গত আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি নির্যাতিত একজন নেতা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তার গাড়িবহরে হামলা হয়। তিনিসহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৫০ জন কর্মী আহত হন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হুইপ নিযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন হলো।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় চিফ হুইপকে সহযোগিতা করার জন্য নিয়োগ পাওয়া ৬ জন হুইপ হলেনÑ হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জিকে গউস, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম, শরিয়তপুর-৩ আসনের মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, নাটোর-২ আসনের অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, দিনাজপুর-৪ আসনের মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এবিএম আশরাফ উদ্দিন (নিজান)।
নবনিযুক্ত হুইপদের মধ্যে নাটোর-২ আসনের অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এবিএম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) এর আগে জাতীয় সংসদের মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৩২ অধ্যাদেশের কী হবে
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩২টি অধ্যাদেশের কী হবে তা নিয়ে এতদিন একটি ধোঁয়াশা ছিল। সেটাও পরিষ্কার হয়েছে গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কথায়। তিনি বলেছেন, ‘সংসদের অধিবেশন শুরুর প্রথম দিনেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সবগুলো অধ্যাদেশই সংসদে উপস্থাপন করা (লে করা) হবে। এরপর কোনটা আইনে রূপান্তর হবে আর কোনটা আইনে রূপান্তর হবে না তা সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে বিগত ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ অনুসরণ করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হতে পারে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাছাই করা অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে তা পাস করা হতে পারে।