এসএসবি ও সচিব সভা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ২২:২৬ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ০০:০১ এএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নতুন সরকারের প্রথম সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভায় প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পদোন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত নবম ব্যাচ থেকে শুরু করে ১৮তম ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক কর্মকর্তাকে সচিব ও সমমর্যাদার পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব কর্মকর্তা বঞ্চিত ছিলেন। পাশাপাশি বঞ্চিত ২৪ ব্যাচের উপ-সচিবদের যুগ্ম সচিব পদোন্নতির বিষয়টিও পুনর্বিবেচনায় আনা হয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
এর আগে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব সভায় দেশের কারাগারের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ হেফাজত ও সংশোধনাগার’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, সচিব ও সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তার একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি হয়েছে। এতে নবম ব্যাচ থেকে শুরু করে ১৫, ১৭ ও ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে তাদের, যারা গত দেড় দশকে রাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি বা পদোন্নতিতে পিছিয়ে পড়েছেন বলে দাবি রয়েছে। ‘লেফট আউট’ হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৯৮৬ ব্যাচের একজন কর্মকর্তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৪ ব্যাচ থেকেও শিগগির একই ধরনের নিয়োগ আসতে পারে।
প্রশাসনে এখন সচিব পদে অন্তত ১৫টি শূন্য পদ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ ফাঁকা। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো, আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো এবং শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য পদেও কেউ নেই।
পদোন্নতির গাণিতিক চাপ
বিসিএস প্রশাসন ও সচিবালয় ক্যাডার একীভূত হওয়ার পর ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬, নবম ও দশম ব্যাচে মোট ১ হাজার ৫৩৩ জন কর্মকর্তা ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৮৫ ব্যাচেই ছিলেন ৫৮৪ জন। অতিরিক্ত সচিবের অনেক পদ সৃষ্টি করে তাদের পদায়ন করা হয়েছিল। তবে এসব ব্যাচের অধিকাংশ কর্মকর্তা এখন অবসরে গেছেন। ফলে বহু পদই শূন্য হয়ে পড়েছে।
এসএসবির অলিখিত নীতিতে সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর চাকরির সুযোগ থাকা কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে পরবর্তী ব্যাচগুলোর কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি না দিলে গ্রেড-১ ও সচিব পদে শূন্যতা ও সংকট তৈরি হতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবার তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মকর্তা সমৃদ্ধ ১৫, ১৭ ও ১৮তম ব্যাচকে সামনে আনা হচ্ছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পর্দার আড়ালে পদ পেতে তদবিরের প্রতিযোগিতা চলছে। তবে সরকার যদি কঠোরভাবে রুল-রেগুলেশন মেনে চলে, তাহলে প্রশাসনে গতি ফিরবে।’
সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশ্লেষক ড. আবদুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দক্ষ আমলাতন্ত্র ছাড়া কোনো নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন বঞ্চিতদের মধ্যে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা আছেন। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। প্রশাসনে স্পৃহা ফিরিয়ে আনতে হলে ন্যায়সংগত পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।’
‘কারাগার’ থেকে ‘হেফাজত ও সংশোধনাগার’ : এর আগে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় দেশের সব কারাগারের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশ কারাগার’-এর নাম হবে ইংরেজিতে ‘বাংলাদেশ কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস’ এবং বাংলায় ‘বাংলাদেশ হেফাজত ও সংশোধনাগার’। এ বিষয়ে গত ৩ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল।
আরও পদ সৃজন ও বিলুপ্তি
প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডে জাইকার অর্থায়নে পাওয়া ২৪টি রেসকিউ বোট ও একটি ট্রেনিং বোট পরিচালনায় ৪২টি নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর দক্ষিণ (শরীয়তপুর) ও উত্তর (মুন্সীগঞ্জ) থানার কার্যক্রম পরিচালনায় অস্থায়ীভাবে ৯টি করে পদ সৃজন করা হয়েছে। পুলিশ টেলিকম সংস্থার ইমার্জেন্সি কল সেন্টারের জন্য ৭৩টি পদ সৃজন এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে ৪ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) পদ সৃজনের প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। একই সঙ্গে ৪ হাজার কনস্টেবল পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।