ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬ ২২:০৯ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ০০:০২ এএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো দৃশ্যত অটুট ও কার্যকর। রয়েছে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং বিস্তৃত অর্গানোগ্রাম ও হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব শূন্য থাকলে এমন কাঠামো কার্যত কতটা অটুট ও কার্যকর থাকেÑ তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ অন্তত ১৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বর্তমানে সচিববিহীন। ফলে নীতিনির্ধারণ, বাজেট বাস্তবায়ন, প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সমন্বয়Ñ সব ক্ষেত্রেই কাজ হচ্ছে ঢিমেতালে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৭৯ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল হওয়ায় এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬। অর্থাৎ প্রশাসনের শীর্ষস্তরে শূন্যতা স্পষ্টতই দৃশ্যমান।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের পথচলার শুরু। শপথের এক দিন আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদ থেকে বিদায় নেন ড. শেখ আব্দুর রশিদ। সেখানে নিয়োগ পান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি। সরকার গঠনের পরদিন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় এবিএম আব্দুস সাত্তারকে। স্বরাষ্ট্র সচিব পদেও মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরীকে নতুনভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরই আসে একযোগে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি, ভূমি আপিল বোর্ড এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন সচিবকে নিজ নিজ দপ্তর থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সূত্র বলছে, এসবই প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ। তবে অন্য মন্ত্রণালয়ে শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে গতি কম। সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে সেটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পাচ্ছে না।
অপর একটি সূত্র জানায়, সচিব হিসেবে যেসব কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় আনা হয়েছে, তাদের মধ্যে কারও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), অভিজ্ঞতা ‘গ্রহণযোগ্য’Ñ যা প্রশাসনের অঘোষিত কিন্তু কার্যকর মানদণ্ড। আবার যাদের এসিআর ভালো, তাদের কারও কারও সচিব পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় ঘাটতি রয়েছে বলে মতামত এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘কাগজে-কলমে যোগ্যতা থাকলেই হয় না। মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়, মাঠ প্রশাসনকে পরিচালনার ক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনাÑ সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল লাগে। এখন সেই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুই নেতৃত্বহীন
সচিব নিয়োগ ও রদবদলের কার্যক্রম পরিচালিত হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগ থেকে। মন্ত্রণালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, এই উইংয়ের নেতৃত্বে থাকার কথা একজন অতিরিক্ত সচিবের। কিন্তু গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পদটি শূন্য। ফলে সচিব নিয়োগের কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াটিই পূর্ণ নেতৃত্বে নেই। সচিব নিজেই এই অনুবিভাগের কার্যক্রম সরাসরি তদারক করছেন। তবে প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, কাঠামোগত ঘাটতি থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
রাজনৈতিক বাস্তবতা বনাম নির্বাচনী অঙ্গীকার
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গঠনের অঙ্গীকার করেছিল। সেখানে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে একমাত্র মাপকাঠি করার প্রতিশ্রুতি ছিল।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘মেরিটোক্রেসি শুধু স্লোগান নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। সচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য প্রধান বিবেচ্য হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক সরকার সব সময়ই একটি আস্থার বলয় তৈরি করতে চায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।’
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুরের মতে, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুরোপুরি খারাপ নয়। অনেক সময় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। কিন্তু নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির স্রোত আটকে গেলে প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। একসঙ্গে একাধিক চুক্তি বাতিল হয়েছে। তাই শূন্যতা পূরণে দ্রুত কিন্তু বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত দরকার।’
প্রসঙ্গত, গত এক দশকে অবসরে যাওয়া আমলাদের চুক্তিতে ফিরিয়ে এনে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রবণতা বেড়েছিল। অনেকের মতে, এতে প্রশাসনের ভেতরে ‘দুই স্তর’ তৈরি হয়। প্রশাসনের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দিলে নিয়মিত কর্মকর্তারা মনে করেন, তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে মনোবল কমে যায়। আবার সরকার মনে করে, আস্থাভাজন লোক ছাড়া বড় নীতি বাস্তবায়ন কঠিন। ফলে চুক্তি পুরোপুরি বন্ধও হয় না।’
পদোন্নতিবঞ্চিতদের প্রত্যাশা
সূত্র বলছে, সম্ভাব্য সচিবের তালিকায় এমন কিছু কর্মকর্তার নাম রয়েছে, যারা বিগত সরকারের আমলে পদোন্নতি পাননি। আবার কেউ কেউ আছেন, যারা বিগত বিএনপি সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
বিসিএস (প্রশাসন) নবম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. সামসুল আলমের প্রসঙ্গ প্রশাসনে বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন। সূত্রমতে, তাকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে নিয়োগ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ অনুমোদিত হয়েছিল। তবে তা কার্যকর হয়নি। এ ধরনের উদাহরণ প্রশাসনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে উস্কে দিয়েছে।
সচিববিহীন মন্ত্রণালয়ের প্রভাব কেবল প্রশাসনিক নয়, নীতিগতও। শিক্ষা খাতে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়নÑ এসব বড় সিদ্ধান্তে সচিবের ভূমিকা মুখ্য। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও সংবেদনশীল ইস্যুতে সমন্বয় জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘সচিব হলেন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান। তিনি নীতিকে বাস্তবায়নের ভাষায় অনুবাদ করেন। শূন্যতা দীর্ঘ হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি আসে, ফাইল ঝুলে থাকে, মাঠপর্যায়ে বার্তা অস্পষ্ট থাকে।’
এখন প্রশ্ন, সরকার কোন পথে যাবে? একদিকে নির্বাচনী অঙ্গীকার, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রশাসনের অনেকে বলছেন, ‘দ্রুততার চেয়ে সঠিক বাছাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শূন্যতা দীর্ঘ হলে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচিব নিয়োগে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন এসিআর মূল্যায়নের পাশাপাশি স্বাধীন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া; চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সময়সীমা ও যুক্তি স্পষ্ট করা; এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শূন্য নেতৃত্ব দ্রুত পূরণ করা।
প্রশাসনের ভেতরে এখন নীরব প্রতীক্ষা। কারা আসবেন, কারা বাদ পড়বেনÑ তা শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতির গতিপথও নির্ধারণ করবে। ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’Ñ এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পায় কি না, সেটার প্রথম পরীক্ষা যেন শুরু হয়ে গেছে সচিব নিয়োগের এই প্রক্রিয়াতেই।