মাসুদ রানা
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৩ এএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬ ০১:২৬ এএম
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ২ মার্চ। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে ঐতিহাসিক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে ফেলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। পতাকার পরিকল্পনা ও অংকন করেন শিল্পী শিব নারায়ণ দাশ। স্মরণকালের ওই বৃহত্তম ছাত্রসভায় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার ও শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
একই দিন দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়। এদিন অফিস-আদালতে কর্মচারীরা কাজে যোগ দেননি; বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট, কল-কারখানা। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে মিছিলে মিছিলে মুখর হয়ে ওঠে দেশের প্রতিটি অঞ্চল। ন্যাপ (ওয়ালী), ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, কৃষক সমিতিসহ বহু সংগঠন হরতাল পালনে অংশগ্রহণ করে। হরতালে সরকারি কর্মকাণ্ড অচল হয়ে পড়ে।
হরতালের সময় পাকিস্তানি পেটোয়া বাহিনী বিক্ষুব্ধ বাঙালির ওপর হামলা চালায়। বেলা ১১টার দিকে ঢাকার ফার্মগেটে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে দুজন শহীদ এবং ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় একজনের পরিচয় তুলে ধরা হয়। খবরে বলা হয়, ‘পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিহত তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র আজিজ মোরশেদ চৌধুরী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।’
এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান একে গণহত্যার শামিল বলে উল্লেখ করে বিকালে একটি বিবৃতি দেন। সন্ধায় এক প্রেস রিলিসের মাধ্যমে ৭ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচিগুলো ছিলÑ
১) ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পূর্ণদিবস প্রদেশব্যাপী হরতাল। কেবল অ্যাম্বুলেন্স, সংবাদপত্রের গাড়ি, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ হরতালের আওতা হতে বাদ যাবে।
২) ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্দিষ্ট ছিল। এ দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হবে।
৩) ৭ মার্চ বেলা ২টায় রেসকোর্স ময়দানে এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে।
রাত পৌনে ৮টায় ঢাকা বেতারে, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করার ঘোষণা প্রচার করা হয়। রেডিও পাকিস্তানের সংবাদে বলা হয়, ‘ঢাকায় ব্যাপক লুঠ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ঢাকায় রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছে।’ এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও শ্রমিক এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা স্লোগান তুলে কারফিউ ভঙ্গের জন্য মিছিল বের করেন। সবার একই স্লোগান ছিল, ‘সান্ধ্য আইন মানি না’, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
ছাত্র-জনতা কারফিউ ভেঙে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। রাতে বিভিন্ন জায়গায় সামরিক বাহিনী জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। সামরিক বাহিনীর গুলিতে ৩ জন শহীদ ও কমপক্ষে ৬০ জন আহত হন।
রাত ১১টা পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ মিছিল চলে। মালিবাগে মিছিলে সেনাবাহিনীর গুলিতে আবুজর গিফারী কলেজের ছাত্র ফারুক ইকবাল নিহত ও ৬ জন আহত হন। ২ মার্চ রাতে সেনাবাহিনী আরও পাঁচজনকে হত্যা করে।
এদিন ঢাকায় হরতাল চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের লাশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শোক মিছিল করে শহীদ মিনারে মিলিত হন। এদিন দেশের প্রায় সর্বত্র হরতাল পালিত হয়। প্রায় জেলাতে ছাত্র-জনতা পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকার বাইরে অন্য শহরগুলোতে এদিনের কর্মসূচি ছিলÑ
ফরিদপুর
পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে তারা স্বাধীনতার শপথ নেন।
খুলনা
জাতীয় অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে খুলনায় পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। সকাল থেকে যান চলাচল, শিক্ষা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। খুলনা কালেক্টরেটসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসের সামনে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে শহীদ হাদিস পার্কের সমাবেশে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করা হয়।
চট্টগ্রাম
জাতীয় অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়। এদিন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে একটি জনসভা করা হয়। ওই জনসভায় পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো হয়। রেয়াজুদ্দিন বাজার থেকে কাপড় কিনে বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করা হয়। জনসভা শেষে ছাত্র-জনতা চট্টগ্রামের আদালত ভবনে যান; সেখানে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
রাজশাহী
রাজশাহীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্ররা ওইদিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন।
বরিশাল
এদিন ছাত্ররা সকাল থেকে বিক্ষোভ মিছিল ও সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেন। বরিশালের আইনজীবীরা সভা ও মিছিলের আয়োজন করেন।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ জেলাসহ বিভিন্ন মহকুমা ও থানা সদরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল-কলেজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে এসে মিছিল করেন। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সাথে অফিস-আদালতের কর্মচারীরা একাত্মতা ঘোষণা করেন।
বেতার টেলিভিশন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাত থেকেই সৈন্য মোতায়েন করা হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় দশ হাজার বাঙালি ছাত্র সমবেত হয়ে ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।
সংবাদে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘রাত্রি সাড়ে ১০টার দিকে দৈনিক সংবাদ অফিসের সম্মুখে কারফিউ ভঙ্গকারী জনতার প্রতি গুলিবর্ষণ করা হয়। দৈনিক সংবাদের পার্শ্ববর্তী এলাকা বংশাল রোড, সিদ্দিক বাজার, মোগলটুলী প্রভৃতি বাণিজ্যকেন্দ্র ও মহল্লাতে কারফিউ ভঙ্গ করে মিছিল হয়। নারিন্দা কলতাবাজার, সদরঘাট, ওয়াইজঘাট প্রভৃতি এলাকা থেকে মুহুর্মুহু স্লোগানের আওয়াজ শোনা যায়। গুলিস্তানসহ বহু এলাকায় অগ্নিশিখা দেখা যায়।’
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ২ মার্চ কারফিউ সম্পর্কে বলা হয়, ‘সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করার জন্য বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ করতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া যায়। সান্ধ্য আইন থাকায় গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে আহতদের হাসপাতালে স্থানান্তর বিলম্ব হয় বলিয়া অভিযোগ শোনা যায়। গুলিবিদ্ধ আমান উল্লাহ নামের ১৩/১৪ বছরের এক ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অধিক রাত্রে প্রাণত্যাগ করে।’