× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আইন ভেঙেই চলছে নসিমন করিমন

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৮ পিএম

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪০ পিএম

নসিমন। ছবি: সংগৃহীত

নসিমন। ছবি: সংগৃহীত

সারা দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে সর্বত্র নসিমন-করিমন-ভটভটি নামের যানগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বেপরোয়া এই যানের কবলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ও অঙ্গহানি ঘটছে অসংখ্য মানুষের। আদালতের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এর চলাচল আটকানো যাচ্ছে না। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। 

২০২৪ সালের ৮ মে সড়ক ও মহাসড়কে নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সাত দিন সময় দিয়ে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি এবং ১০ জেলার পুলিশ সুপার বরাবর আইনি নোটিস পাঠানো হয়। জেলাগুলো হলোÑ যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, নড়াইল, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, মাগুরা ও বাগেরহাট। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে ২০২৪ সালের ৮ মে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ ডাকযোগে নোটিসটি পাঠান।

এর আগে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি সারা দেশের মহাসড়কে অবৈধ (অনিবন্ধিত) নসিমন-করিমন চলাচল বন্ধের জন্য সার্কুলার জারি করতে সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ১০ জেলার মহাসড়কে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার বাহন নসিমন ও করিমন চলাচল বন্ধের রায় দিয়েছেন আদালত। এর আগে সড়ক-মহাসড়কে মোটরযান চলাচলে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে মোটরযান অধ্যাদেশ অনুসরণ করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। ওই রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে আদালত এ আদেশ দেন।

মাঠ চাষের ট্রাক্টরের ইঞ্জিনকে রূপান্তর ঘটিয়ে নসিমন-করিমন তৈরি করা হয়। এতে মোটা চাকার কাঠের ভ্যান আকৃতি দিয়ে পণ্য ও মানুষ বহনের আসন তৈরি করা হয়। বিভিন্ন পাওয়ারের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশ কিছু জেলায় নিয়মিত তৈরি হচ্ছে মালামাল পরিবহনের নসিমন গাড়ি। এই প্রতিবেদকের কথা হয় ঝিনাইদহ সদরের চুয়াডাঙ্গা রোডের ডাকবাংলা বাজারের রফিক ইজ্ঞিনিয়ারিংয়ের ওসমান গনির সাথে। বাবার প্রতিষ্ঠান দেখভাল করা গনি জানান, ২ লাখ ৯০ হাজার টাকায় ২৫ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন দিয়ে একটি নসিমন গাড়ি তৈরি করে দিতে পারে তার প্রতিষ্ঠান। ৬৫ মণ মালামালের লোড নিতে পারবে গাড়িটি।

এ বছরের ১৭ জানুয়ারি মোংলা উপজেলার গাছির মোড় এলাকায় রাতের বেলা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নসিমন উল্টে চালকসহ রোকন উদ্দিন (৬০) ও দিদার মোল্লা (৩২) নামে দুজন নিহত হন। এ সময় আহত হন আরও দুজন। চলতি বছরের শুরুতে শরীয়তপুর উপজেলার নড়িয়া শহরে এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় দক্ষিণ নড়িয়ার একজন তরুণ ব্যবসায়ী মারা যান। নড়িয়া থানার সামনেই এ ঘটনা ঘটে। 

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ভোলা-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বাপ্তা ইউনিয়নের বুড়ির মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও নসিমনের সংঘর্ষে মায়ের কোলে থাকা শিশুসন্তান আব্দুল্লাহর প্রাণ যায়। আরও এক যাত্রী গুরুতর আহত হয়। ২০২৫ সালের ১৩ জুন সকালে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে উচিৎপুরা-রামচন্দ্রদী সড়কের গহরদী এলাকায় নসিমন উল্টে মাছ ব্যবসায়ী আলী আকবর (৬৫) নামের একজন নিহত হন। ২০২৫ সালে ১ মে পাবনার ঈশ্বরদীতে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে নসিমন ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে মো. আকমল হোসেন (৩৫) নামে একজন নিহত হন। 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের (নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, টমটম, মাহিন্দ্র) দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৩১ জন নিহত হন। 

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, কয়রা, তেরখাদা উপজেলার পাশাপাশি লোয়ার যশোর রোড, দৌলতপুর, ফুলবাড়ীগেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দিনের আলোতেই অবাধে চলাচল করছে এসব যানবাহন। বিশেষ করে পাওয়ার টিলারচালিত ট্রলি ও ভটভটির কারণে ব্যস্ত সড়কগুলোতে নিয়মিত যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

যশোর জেলায় বর্তমানে প্রায় ১৮টি রুটে আনুমানিক পাঁচ হাজার নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচল করছে। যশোর-খুলনা মহাসড়কসহ আঞ্চলিক সড়কে এসব যানবাহন প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে, যার ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। 

সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় কৃষিপণ্য পরিবহনের আড়ালে এসব যানবাহনে যাত্রী ও নির্মাণসামগ্রী বহন করা হচ্ছে। বাগেরহাটের ফকিরহাট ও মোল্লাহাট এলাকায় প্রায়ই নসিমন-করিমন উল্টে পড়ার ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় এক বাসচালক বলেন, মহাসড়কে ধীরগতির এসব গাড়ির কারণে হঠাৎ ব্রেক করতে গিয়ে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।

কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলায় স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত এসব যানবাহনের কোনো ফিটনেস বা লাইসেন্স নেই। অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের চালকের আসনে দেখা যাচ্ছে। ঝিনাইদহে চলতি বছর সংঘটিত একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় এসব যানবাহনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ।

চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ ও মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কে নসিমন ও ভটভটির আধিপত্য স্পষ্ট। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনছে না। নড়াইলেও গ্রামীণ সড়কের জন্য তৈরি এসব যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করায় ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই খুলনা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, মহাসড়কে নসিমন-করিমনসহ তিন চাকার বিভিন্ন যান চলাচল অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু খুলনায় এই নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না। প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না।

খুলনা বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২ সালের ৪ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ৬১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৬১৪ জন নিহত এবং ৬১৪ জন আহত হয়েছে। একই সময়কালে যশোরে ১০৯ দুর্ঘটনায় ১০৭ জন নিহত ও ১০৪ জন আহত; খুলনা জেলায় ৩৪ দুর্ঘটনায় ৪৩ জন নিহত ও ৩৮ জন আহত হয়েছে। বিআরটিএ খুলনা সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) উসমান সরওয়ার আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অনুমোদনহীন যানবাহন সড়কে চলাচল বেআইনি। 

খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, হাইকোর্টের চার দফা নির্দেশনায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় মহাসড়কে নসিমন, করিমন ও ভটভটির চলাচল বন্ধের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। তবে চাঁদাবাজি ও প্রভাবশালী মহলের কারণে নির্দেশনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগীয় শহরেও এক হাজারের বেশি নসিমন-করিমন চলাচল করছে। মাছ, কৃষিপণ্য,নির্মাণসামগ্রী ও গরু পরিবহনে নিয়মিত এই গাড়ি ব্যব্হৃত হয়। এ বিষয়ে বিআরটিএ রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. ফয়সালকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুর শহরেও রয়েছে নসিমন-করিমন চলাচলের আধিক্য। এ ছাড়া ঢাকা-রংপুর মহসড়ক এবং লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম-রংপুর আঞ্চলিক মহাসড়কেও বিপুলসংখ্যক নসিমন-করিমন চলাচল করছে। 

সিলেট শহর ও আশপাশের জেলাতেও নসিমন-করিমন চলাচল করছে। তবে সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে জানা গেছে। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসন অবৈধ এসব যান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। 

বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তার কাছে নসিমন-করিমন চলাচলের বিষয়ে সুনিদিষ্ট কোনো তথ্য আপাতত নেই। বিস্তারিত জেনে পরে এ বিষয়ে জানাবেন বলে তিনি প্রতিবেদককে জানান। তবে ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের ট্রাফিক আইন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) বিধিমালা অনুযায়ী, নসিমন, করিমন, ভটভটি বা অস্থানীয়-অনুমোদনহীন যান সড়কে চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব অবৈধ যানবাহন সড়কে পাওয়া গেলে জরিমানা ও আটকের আইন করা হয়েছে। নসিমন-করিমনের মতো যান্ত্রিক বা অর্ধযান্ত্রিক যানবাহনের কোনো বৈধ কাগজপত্র (ফিটনেস, রুট পারমিট) বিআরটিএ দেয় না। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অধীনে এগুলো অবৈধ।

এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশেকে বলেন, সর্বশেষ আদালতের রায়ে নসিমন-করিমন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী পক্ষের সহায়তায় স্থানীয়ভাবে এসব যান চালানো হয়। এসব যানবাহনের সংঘর্ষে যত মানুষ মারা গেছে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সরকার ও তার প্রশাসনের। তিনি আরও বলেন, যদি কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি স্থানীয় পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা করতে আসে তাহলে আমি মামলা লড়তে প্রস্তুত রয়েছি। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা দেশে অবৈধ এসব যানবাহনের দাপট এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি বড় জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা