হোসেন শহীদ মজনু
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৫ এএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৬ এএম
পরিবর্তনের ডামাডোলে সঠিক-যোগ্যদের স্থান দেওয়াও সরকারের বড় একটি কাজ। আর উচিত হবে আইজিপির বিদায়-যোগদানের মতো দৃষ্টান্তকে উৎসাহিত করা। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সকালের সূর্য দেখে বলে দেওয়া যায় দিনটি কেমন যাবে। আদতে মনে হয় কথাটা সবসময় সত্যি নয়। আর দশটা দিনের মতো গত বুধবারও একটি দিন ছিল। আগের দিনের সংবাদ মাধ্যম কিংবা দিনটিতে প্রকাশিত সংবাদপত্রের পাতায় ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ড’ বিষয়ে সবাই নতুন করে পুরনো দুঃসহ সময়কে স্মরণ করেন। শহিদ সেনাদের স্মৃতিস্মম্ভে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে বিচার দাবি করেন নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের। দিনের শুরুর দিকে বড় ঘটনা ছিল এটিই। কিন্তু ক্রমশ প্রকাশ্য হিসেবে আরও দুটি বৈপরিত্যময় ঘটনা দিনটিকে শেষবেলায় এসে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
ঘটনা দুটির একটি ফুলেল শুভেচ্ছায় হাসিমুখে বিদায় ও যোগদান অনুষ্ঠান। আরেকটিও বিদায়; তবে সেটা পরিস্থিতির চাপে ও নীরস বদনে। ভালো ঘটনার প্রচার বেশি করতে হয়, সবাইকে জানাতে হয়। অন্যরাও প্রাণিত হন ভালো কিছু করার জন্য। তবে খারাপটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত সাংবাদিকতায় খারাপটাই সবচেয়ে ‘ভালো’ খবর! আমরা ভালো খবরটির দিকে একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে এগিয়ে যেতে পারি। তারপর অন্যটি।
এক.
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনীতির গতানুগতিক ধারা ভেঙে ভিন্ন কিছু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। যেমনÑ বিজয়ী হয়ে জামায়াত আমির, এনসিপি প্রধান কিংবা চরমোনাই পীরের বাসায় উপস্থিত হয়ে কুশল বিনিময় করেছেন। ১৭ বছরের চেপে থাকা গুমোট পরিবেশ পেরিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন অস্থিতিশীলতা সরিয়ে শান্ত-ধীর স্বাভাবিক হয়ে উঠছে চারপাশ। ক্ষমতাগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘অপহৃত স্কুলছাত্র উদ্ধারে’ পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, জনসম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টায় ব্যতিক্রমী সব কাজে নিজেকে যুক্ত করে চলেছেন। তার অনুসরণে-অনুকরণে ভালোর; সুন্দরের প্রসার চোখে প্রশান্তি আনছে আমাদের মতো আমজনতার। তখনই গত বুধবার সুন্দর-অসুন্দরের একটা অভিঘাত আমাদের মনকে দুভাবেই নাড়িয়ে দেয়। মানুষ মাত্রই সুন্দরের পুজারি, তাই আমরা প্রথমে দেখে নিতে পারি সুন্দর ঘটনাটির ফ্ল্যাশব্যাক।
ফুলের চেয়ে সুন্দর কিছু নয়; সেই ফুল হাতে বিদায়ী আইজিপি বাহারুল আলম ও নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। এমন একটি সুন্দর ছবি বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরের সৌজন্যে বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। বিদায়ী ও নবাগতের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ হাসিমুখের ছবি দেখে আমরা আপ্লুত হই, আমাদের ইতিবাচক ভাবনাগুলো ডালপালা মেলে। এই সংস্কৃতিই তো চর্চা হওয়া দরকার সর্বত্র। খবরটির ভেতরে আরও সুন্দর একটা বার্তা মেলে। পুলিশ সদর দপ্তরের হল অব প্রাইডে বাহারুল আলমের বিদায় ও আলী হোসেনের বরণ অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজি, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বিদায়ী আইজিপির বর্ণিল কর্মজীবনের নানা দিক সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন। এ সময় নবনিযুক্ত আইজিপি আলী হোসেনকে স্বাগত জানিয়ে তাকে পেশাদার কর্মকর্তা উল্লেখ করেন বক্তারা। আলী হোসেন ফকিরকে একজন দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে বাহারুল আলম বলেন, নবনিযুক্ত আইজিপি বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সক্ষম হবেন।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিদায়ী আইজিপি নবাগতের প্রশংসা করেছেন। এমন চর্চায় আমরা খুব বেশি অভ্যস্ত নই; অথচ এমনটিই সবচেয়ে বেশি হওয়া উচিত।
দুই.
আইজিপির যোগদানের সুন্দর খবরটি আমরা যখন বিকালবেলা পড়ছি, তখন দুপুরের পরপর যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটিকেও মেলানোর চেষ্টা করছি। এটিও সুন্দর হতে পারত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিদায় হতে পারত ন্যূনতম শালীনতায়। কেউ কেউ হয়তো বলবেন উনি যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই বিদায় হয়েছেন। এ প্রসঙ্গেও বলার আছে, সেটা পরে বলি। ঘটনার সারসংক্ষেপে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারি আমরাÑ বুধবার সকালে বিভিন্ন দাবি ও তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো-বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।
প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। উনার (গভর্নর) অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগত বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে উনাকে জবাবদিহি করতে হবে।” বিক্ষোভ-সমাবেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, “গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিসের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা আমাদের শোকজ নোটিস ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাব। আর রবিবার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”
কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভার পর আহসান এইচ মনসুর তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় পরিচালিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন। কর্মকর্তাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলতে হবে। যদি কেউ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সংবাদ সম্মেলন করার পরপরই জানতে পারেন, নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এরপর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যান।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘মব’ তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। তারা ‘ধর ধর’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় আহসান উল্লার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক অতিরিক্ত পরিচালক।
তিন.
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকে বিক্ষোভ-সমাবেশ ঘিরে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তা নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করেছিল। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন ‘মব’ হলো, তখন পুলিশের কোনো ভূমিকা কি চোখে পড়েছে?
এই ঘটনায় কতগুলো প্রশ্ন সামনে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক ভালো কিছুর মধ্যে ভয়াবহভাবে সামনে আসে ‘মব কালচার’। পুলিশ-প্রশাসনের চোখের সামনে এসব ঘটলেও তারা ‘নিরুপায়-নির্বিকার’ ছিল কিংবা থাকতে বাধ্য হয়েছিল! যার ব্যর্থতা অন্তর্বর্তী সরকারকে বড় প্রশ্নের মুখেও দাঁড় করিয়েছিল। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো মব নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতি বারবার আহ্বান জানিয়েছিল। সেই ‘মব’ নিয়ন্ত্রণে সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকারের কি কিছুই করার ছিল না। এ কথাও অনেকে বলতে পারেন, আগে মব হয়েছে; এখন হলে সমস্যা কী? ওরা মব করেছে, আমরা কেন করব না। তাদের জন্য শুধু এটুকু বলা, ‘তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?’
কেউ কেউ বলতে পারেন, আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভায় বক্তারা যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেন, তা তো সত্যি। হ্যাঁ; অভিযোগ যদি সত্যও হয়। তার বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্দোলনকারী কর্মকর্তারা যেমন নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিক্ষোভ করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বক্তব্যে পরবর্তী কর্মসূচিও দিয়েছিলেন। তেমনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আহসান এইচ মনসুরকে বিদায়ও দেওয়া যেত। অনেকে বলছেন, ঘটনাদৃষ্টে মনে হয়েছে অনেকটা তড়িঘড়ি করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাই ব্যাপারটা যতটা শোভন হবার কথা ছিল, তেমনটি হয়নি।
নতুন গভর্নর ইস্যুতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। তিনি খুবই যৌক্তিক কথা বলেছেন। সচিবালয়ে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, কোন বিবেচনায় গভর্নর পরিবর্তন করা হলো? তিনি বলেন, “বিবেচনার তো কিছু নেই। একটা নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি। প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় হবে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা “
তবে একটি প্রশ্ন সাংবাদিকরা করেননি, যেটার উত্তর অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে জানার কৌতূহল ছিল আমাদের মতো আমজনতার। প্রশ্নটি হচ্ছেÑ এরকম তড়িঘড়ি করে টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কেন তাকে বিদায় করা হলো। এই পরিবর্তনটা ‘খুবই স্বাভাবিক’ভাবে কি করা সম্ভব ছিল না।
অর্থমন্ত্রীর কথার সুরে সুর মিলিয়ে আমরা এটা বলতে পারি, পরিবর্তন যে আসবেÑ সেটা বিভিন্ন সেক্টরের প্রধানদের বিশেষত যারা গত দেড় বছরে নানা উপায়ে পদ বাগিয়েছেন, তাদের ভাবনায় রাখা উচিত। একই সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পথ অনুসরণ করা উচিত তাদের। পাশাপাশি সরকারেরও উচিত পরিবর্তনটাকে কার্যকরে কৌশলী হওয়া। কাউকে পছন্দ না হলে তাকে সরানোর জন্য নির্বাচিত সরকারের নিশ্চয় ‘মব’ বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের প্রয়োজন পড়ে না।
একই সঙ্গে পরিবর্তনের ডামাডোলে সঠিক-যোগ্যদের স্থান দেওয়াও সরকারের বড় একটি কাজ। আর উচিত হবে আইজিপির বিদায়-যোগদানের মতো দৃষ্টান্তকে উৎসাহিত করা। সদ্য শেষ হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা জনগণের ম্যান্ডেট পাননি, তাদের পুরস্কৃত করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা সিটি করপোরেশনে পদায়নে কোনো মহিমা প্রকাশিত হয় না, বরং যারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচনে অংশ নেননি, সংযম ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের পুরস্কৃত করলে নেতাকর্মীরা ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ হবেন। সুন্দরের জয় হোক, ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অন্য অঙ্গগুলোও সক্রিয় হোক।