× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সচিবসহ শীর্ষ পদে ফের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৩ এএম

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৫ এএম

সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে। সরকারের হাতে বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে। সরকারের হাতে বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা নতুন সরকার গঠনের পরও অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে।

এর আগে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তরে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলেও ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনে অনৈক্য, অস্বচ্ছতা ও অসন্তোষ বহাল ছিল। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সময় এই প্রবণতার অবসান ঘটবে। কিন্তু শুরুতেই এই প্রত্যাশায় ছেদ পড়েছে এবং এ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। 

নিয়মিত পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা বর্তমান সরকারের অনুগত দক্ষ অতিরিক্ত সচিবরা বলছেন, এতে তাদের স্বাভাবিক ক্যারিয়ারের অগ্রগতি ব্যাহত হতে চলেছে। তবে সরকারের আরেকটি পক্ষ বলছে, “অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবং প্রশাসনকে গতিশীল রাখার স্বার্থে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগের আপাতত বিকল্প নেই।”

এই দ্বৈত অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে নীরব অস্বস্তি। প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, “সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আঠারো মাসের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা থাকায় পদোন্নতির স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়েছে। এতে কেবল একটি নয়, পরপর কয়েকটি ব্যাচ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আইনি কাঠামো

সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে। সরকারের হাতে বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই বিধান মূলত বিশেষ পরিস্থিতি বা দক্ষতার ঘাটতি পূরণের জন্য। কিন্তু যখন তা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, এটি কি নীতিগত ব্যতিক্রম, নাকি নতুন প্রথা?”

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, “চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আইনের ভেতরে হলেও এর ব্যবহার যদি ব্যাপক হয়, তাহলে সেটি প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এতে নিয়মিত পদোন্নতির প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।” 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের শীর্ষ কাঠামোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব পদের মধ্যে রয়েছেÑ মন্ত্রিপরিষদ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ। এগুলোর মধ্যে নতুন সরকারের সময় নয়জন সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করলেও গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে থাকা সচিবরা বহাল রয়েছেন।

প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, এসব পদে অবসরোত্তর কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর চুক্তি নবায়নের নজির রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত রাজনৈতিক আমলে বঞ্চিত হওয়া বা ‘যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ না পাওয়া’র যুক্তি দেখিয়ে তাদের পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে পদোন্নতিপ্রত্যাশীরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের আমলেও বঞ্চনার প্রতিকার করতে গিয়ে নতুন বঞ্চনার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সূত্র বলছে, প্রশাসনে সচিব পদে পদোন্নতির একটি নির্দিষ্ট ধাপ আছেÑ অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব পর্যায় থেকে ক্রমান্বয়ে ওপরে ওঠেন কর্মকর্তারা। কিন্তু কোনো সচিব দীর্ঘ সময় চুক্তিতে বহাল থাকলে, তার নিচের ধাপে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে যায়।

একাধিক ব্যাচের কর্মকর্তা জানান, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন না হওয়ায় তাদের প্রমোশন বোর্ড বসেনি বা প্রত্যাশিত পদায়ন হয়নি। 

একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক সচিব থাকলে তারা জানেন, অন্তত আরও এক বছর কোনো সুযোগ নেই। এতে কাজের উৎসাহও কমে।’ 

সরকারের যুক্তি অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রকল্প, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার। সব সময়ই সমমানের বিকল্প পাওয়া যায় না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ স্থায়ী সমাধান নয়, বরং অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা।’

এই যুক্তির পক্ষে কেউ কেউ বলেন, “জটিল প্রশাসনিক বাস্তবতায় হঠাৎ নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি হবে। সমস্যা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নয়, এর ঘনত্ব ও স্বচ্ছতায়।” 

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড, আব্দুস সবুর বলেন, “যদি ব্যতিক্রমী দক্ষতা বা বিশেষ প্রকল্পের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়, তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখন দেখা যায়, নিয়মিত পদোন্নতির লাইন থাকা সত্ত্বেও অবসরপ্রাপ্তদের রাখা হচ্ছে, তখন ভেতরে হতাশা তৈরি হয়।”

তিনি মনে করেন, “এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট নীতিমালা ও সময়সীমা প্রকাশ করা উচিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটিকে ব্যতিক্রমী রাখাই বাঞ্ছনীয়।”

অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের প্রভাব

প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষের প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কর্মদক্ষতায় প্রভাব ফেলতে পারে। পদোন্নতি একটি বড় প্রণোদনা। যখন কর্মকর্তারা মনে করেন, যোগ্যতা ও সিনিয়রিটির বাইরে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তখন মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মকর্তারা নিয়ম মেনে কাজ করেন, সিনিয়রিটি ধরে এগিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ অবসরপ্রাপ্ত কেউ এসে শীর্ষ পদে বসলে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে যায়। প্রশাসনের ভেতরে অনেকে মনে করেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব থাকতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ প্রশাসনিক পদে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের রাখার প্রবণতা নতুন নয়। তবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পেশাদারত্বের প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি হারায়, তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

সূত্রমতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও অবসরোত্তর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নজির আছে। তবে সেখানে সাধারণত নির্দিষ্ট প্রকল্প বা বিশেষজ্ঞ পদে সীমাবদ্ধ থাকে। ভারতে কেন্দ্রীয় সচিব পর্যায়ে অবসরোত্তর নিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম এবং স্পষ্ট নীতিমালার অধীন। বাংলাদেশে এ নিয়ে প্রকাশ্য তথ্যভান্ডার বা পরিসংখ্যান সীমিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের শীর্ষ পদে ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ হয়ে উঠতে পারে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হবে। আবার সরকারের দৃষ্টিতে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে। এই টানাপড়েনের সমাধান নির্ভর করছে নীতিগত স্বচ্ছতা ও ভারসাম্যের ওপর। প্রশাসনের ভেতরের অসন্তোষ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণ ও সেবাদানের মানে প্রভাব ফেলতে পারে।

তারা বলছেন, রাষ্ট্রের প্রশাসন কেবল নীতির বাস্তবায়নকারী নয়; এটি নাগরিক আস্থারও ভিত্তি। সেই আস্থা রক্ষায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিÑ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রশ্নেও তার ব্যতিক্রম নয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা