মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪১ পিএম
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। ফাইল ফটো
বহুল আলোচিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ নির্দেশ দেন তিনি। তবে তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য এক সভা শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম এটি চালু করার সময়সীমা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। ওইদিন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বৈঠকটিকে ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনালের ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হলেও ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে চার শিফটে কাজ করার জন্য মোট ৬ হাজার কর্মীর প্রয়োজন হবে। এদের মধ্যে ৪ হাজার নিরাপত্তাকর্মী থাকবে। টার্মিনাল চালুর জন্য জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের জন্য অন্তত ৬ মাস সময় লাগবে। এ ছাড়া টার্মিনালের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি এখনও প্রণয়ন করা হয়নি।
২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটিকে তড়িঘড়ি করে আংশিক উদ্বোধন করেন। তবে তখনও এটি ব্যবহার উপযোগী হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণীতে পরিবর্তন এলে তারাও থার্ড টর্মিনাল কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের পর তখন বেবিচক জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের মধ্যে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, যদিও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এটি চালু করা যায়নি। পাশাপাশি টার্মিনাল ভবনের ভেতরের কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটিও অন্যতম কারণ।
গতকাল সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে প্রথমেই টার্মিনাল এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা এই প্রতিবেদককে টার্মিনাল-৩ এলাকায় প্রবেশে বাধা দেন। অনুমতির জন্য টার্মিনাল-১-এ গেলে সেখান থেকে টার্মিনাল-২-এ যেতে বলা হয়। সেখান থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদের ব্যক্তিগত নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি থার্ড টার্মিনাল এলাকার পরিদর্শন পাস দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে বলেন, এখনও থার্ড টার্মিনালে কাজের দায়িত্বে নিয়োজিতরা তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়নি।
বেবিচক সূত্র জানায়, টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে না পারায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎজ এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত রাজস্ব ভাগাভাগির হার সরকারের কাছে বেশি মনে হওয়ায় চুক্তিটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন চলতি বছরের শুরুতে বলেছিলেন, এ টার্মিনাল চালু নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জাপানের মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনায় সফল হয়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যায়, চুক্তির শর্তের বিষয়ে দুই পক্ষ সঠিক বোঝাপড়ায় পৌঁছতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকার ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৭ সালে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয়েছিল এর নির্মাণকাজ। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দিয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণ। টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। ২০২৪ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কথা থাকলেও আজও হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের চেষ্টা থাকলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তহীনতা ও টার্মিনাল ভবনের ভেতরের কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে চালু করা যায়নি বলে দাবি বেবিচক কর্মকর্তাদের। তাদের মতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তৃতীয় টার্মিনাল চালু নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
এদিকে প্রায় ১৮ মাস বন্ধ আছে থার্ড টার্মিনালের কাজ। আশা করা হচ্ছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ায় শিগগিরই সকল বাধা পেরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটির কাজ আগাবে।