বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:০৯ এএম
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩২ এএম
বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যের পরনে নতুন পোশাক। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ পুলিশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নন এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এক বিবৃতিতে সোমবার সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান পিপিএম বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের খাকি ইউনিফর্ম কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়নি। ২০০৩-০৪ সালে তৎকালীন সরকারের গঠিত একটি কমিটি দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে এ পোশাক নির্ধারণ করে। সে সময় পুলিশ সদস্যদের গায়ের রঙ, দেশের আবহাওয়া, দিন ও রাতের ডিউটিতে সহজে চিহ্নিত হওয়ার সুবিধা এবং অন্য বাহিনীর সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সূত্র বলছে, খাকি পোশাক শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচয়ের প্রতীক নয়; এটি বাহিনীর ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের ধারক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে এসেছে। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই ইউনিফর্ম জনমনে একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। ফলে হঠাৎ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, নতুন যে পোশাক নির্বাচন করা হয়েছে তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের মতামত নেওয়া হয়নি। নতুন পোশাকের নকশা ও রঙ অন্যান্য ইউনিফর্মধারী সংস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারেÑ এমন মতামত বিভিন্ন জেলা ও ইউনিট থেকে সংগঠনের কাছে এসেছে।
অ্যাসোসিয়েশন তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, ওই নির্বাচনে পুলিশ সদস্যরা বিদ্যমান পোশাক পরিহিত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে ভূমিকা রাখেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক মহলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদার ভূমিকার প্রশংসা উঠে আসে।
সংগঠনটির ভাষ্য, যে পোশাক পরিধান করে বাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের যৌক্তিকতা আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। অর্থনৈতিক দিকটিও আলোচনায় এসেছে। ইউনিফর্ম পরিবর্তন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া-নতুন কাপড়, নকশা, সরবরাহব্যবস্থা, পুরোনো মজুত বাতিলসহ নানা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ব্যয় কতটা প্রয়োজনীয়-সে প্রশ্ন তুলেছে অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, একই অর্থ বাহিনীর আধুনিকায়ন, থানা পর্যায়ে যানবাহন বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার এবং লজিস্টিক সহায়তা বাড়াতে ব্যবহার করা অধিক ফলপ্রসূ হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউনিফর্ম কেবল বাহ্যিক চেহারার বিষয় নয়; এটি জনআস্থা, পরিচিতি এবং মনোবলের সঙ্গেও যুক্ত। দীর্ঘদিনের একটি প্রতীক হঠাৎ বদলে গেলে সদস্যদের মানসিকতায় প্রভাব পড়তে পারে। আবার সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিকায়ন বা নীতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও ইউনিফর্ম পরিবর্তন দেখা হতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল রং বা নকশার বিতর্ক নয়; বরং প্রশাসনিক দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের প্রশ্নও এতে জড়িত।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছে-পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আরও গবেষণা, অংশীজনদের মতামত এবং জনমত যাচাইয়ের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। সংগঠনটির ভাষ্য, রং বা নকশা নয়; বরং সদস্যদের মনোবল, মানসিকতা ও পেশাদারিত্বের উন্নয়নই এখন সময়ের দাবি।

সরকারি মহল থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি। তবে পুলিশ বাহিনীর মতো একটি বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রশ্নে নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক-তিন দিকই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।