× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশাসন শীর্ষে পদ পেতে তৎপর বঞ্চিতরা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:২৪ এএম

বাংলাদেশ সচিবালয়। ছবি: বাসস

বাংলাদেশ সচিবালয়। ছবি: বাসস

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, দপ্তর প্রধান, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক পদ রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতিনির্ধারণী মেরুদণ্ড। এ পদগুলোতে নিয়োগ ও পদায়ন বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়। সরকারের নীতি প্রণয়ন, বাজেট বাস্তবায়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের কার্যকারিতা-সব ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রাক্কালে বা পরপরই এই সংবেদনশীলতা তাই আরও বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশাসনে পদপদবি পেতে 'বিএনপিপন্থী' হিসেবে পরিচিত বঞ্চিত সাবেক আমলাদের দৌড়ঝাঁপ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

বঞ্চিত এই কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত থাকার পরও বিগত আঠারো মাসে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত বেশ কিছু সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে পদায়নের জন্য সক্রিয় এই বঞ্চিত কর্মকর্তারা নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছেও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও ব্যাচের জ্যেষ্ঠতা থাকার পরও তাদের 'বিএনপিপন্থী' ট্যাগ দিয়ে বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হয়েছে, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে এখন তাই প্রশাসনে সংস্কার ও পদায়ন-পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আস্থা, জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা- সবকিছুর জটিল সমীকরণ দেখা দিয়েছে। তবে বঞ্চিতদের এই অভিযোগ কতটা ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা, আর কতটা রাজনৈতিক পাল্টা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তা নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সূত্র মতে, সরকারের সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন সাধারণত প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিবদের মধ্যে থেকেই হয়। আবার কখনও কখনও রাষ্ট্রপতির কোটায় অন্য ক্যাডার থেকেও সচিব পদায়ন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ থাকে-সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশ, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) ও সার্ভিস রেকর্ড মূল্যায়ন। থাকে জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও শূন্যপদের বিবেচনা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন। নিয়মে যোগ্যতা, দক্ষতা ও শৃঙ্খলা রেকর্ডের কথা বলা হলেও বাস্তবে 'নীতিগত আস্থা' গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রশাসনের ভেতর-বাইরে দীর্ঘদিন ধরেই এমন অভিমত আলোচিত হয়ে আসছে।

সক্রিয় 'বঞ্চিত' কর্মকর্তারা সূত্র জানাচ্ছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হলেই প্রশাসনের ভেতরে নানা অদৃশ্য স্রোত তৈরি হয়- এমন পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিনের। বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডার ক্লাব, অবসরপ্রাপ্ত প্রভাবশালী আমলা, এমনকি রাজনৈতিক

মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গেও কর্মকর্তাদের যোগাযোগ স্থাপন ও বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের 'বঞ্চিত' তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে তুলে ধরছেন। বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো অভিযোগ ছিল না। তারপরও দীর্ঘদিন পদোন্নতি পাননি। এখন তাদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এ কাজে সাফল্য পেতে পুরনো ছাত্রসংগঠন বা রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে, আঞ্চলিক বা পারিবারিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে, অবসরপ্রাপ্ত প্রভাবশালী সচিবদের মাধ্যমে সুপারিশ পৌঁছান হচ্ছে এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে নীরব যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। 'দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীনতা' সংশোধনের দাবি তুলে ধরে চেষ্টা করা হচ্ছে রাজনৈতিক মহলের সমর্থন আদায়ের।

বিগত দেড় দশকে সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক গোষ্ঠী প্রাধান্য পেয়েছে- এমন অভিযোগ বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ কর্মকর্তার। তাদের দাবি, ব্যাচের জ্যেষ্ঠ হয়েও সচিব পদ পাননি। যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিব হয়ে অবসরে যেতে হয়েছে। ফলে সচিব না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ওএসডি বা কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদোন্নতি বঞ্চিত এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল না। তবু 'বিএনপি' রাজনৈতিক ট্যাগ বা সন্দেহের কারণে তারা পদোন্নতিতে পিছিয়ে পড়েছেন। পদোন্নতি সব সময় সীমিত শূন্যপদে হয় এবং সবাই সচিব হতে পারবেন না। তবুও অতীতের বঞ্চনা ও পারফরম্যান্সের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক জনপ্রশাসন সচিব বলেন, 'সচিব পদ রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। সরকার তার নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আস্থাভাজন কর্মকর্তাকে চাইবে- এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা হয়, যখন সেটি একমাত্র মানদন্ডে পরিণত হয়।'

সচিব পদের গুরুত্ব: সচিব পদ কেবল প্রশাসনিক পদোন্নতি নয়- এটি নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার কেন্দ্র। বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন, বড় নিয়োগ ও বদলির সুপারিশ, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দাতা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় ও নির্বাচনী সময়ে মাঠ প্রশাসনের তদারকি এই পদ থেকেই করা হয়। বিশেষ করে অর্থ,

স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ, শিক্ষা-এসব মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, 'সচিব পদে দলীয় আনুগত্যের ধারণা তৈরি হলে পুরো প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ নিচের স্তর তখন সংকেত পায় যে, যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সচিব পদে উন্নীত হওয়ার আগে বাধ্যতামূলক পারফরম্যান্স অডিট ও ৩৬০-ডিগ্রি মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে।'

পরিসংখ্যানের আড়ালে রূঢ় বাস্তবতা: বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার ১৫, ১৭ও ১৮ ব্যাচের অতিরিক্ত সচিবদের একটি বড় অংশ সচিব পদে উন্নীত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সচিবের শূন্যপদ সীমিত। সীমিত কয়েকটি সচিব পদ পূরণের জন্যে বর্তমানে তাই শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ক্ষমতায় যে সরকারই আসুক বা থাকুক, সচিব পদে 'পাল্টা দলীয় ভারসাম্য' আনার প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে হবে। সচিব পদে পদায়ন কি 'বঞ্চিতদের পুনর্বাসন' নীতিতে হবে, নাকি কঠোর যোগ্যতাভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করা হবে? যদি রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে নির্ধারক হয়, তবে প্রশাসনের পেশাদার সংস্কৃতি আরও দুর্বল হতে পারে। আবার প্রকৃত বঞ্চনার সংশোধন না হলে অসন্তোষ জমাট বাঁধবে। তবে সচিব পদ রাষ্ট্রের, কোনো দলের নয়- এই পদে পদায়ন হওয়া প্রয়োজন এমন মানদণ্ডে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশ ঠিক করবে।

জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শীর্ষ সচিব পদে পদায়ন নিয়ে বর্তমান দৌড়ঝাঁপ প্রশাসনের গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বঞ্চনার অভিযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন- এই দুইয়ের মধ্যে পেশাদারত্বের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন যদি সত্যিই নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামোর রূপ নিতে চায়, তবে সচিব পদে পদায়নের প্রক্রিয়াকে হতে হবে স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। কারণ সচিবালয়ের এই কক্ষগুলোতেই রাষ্ট্রের আগামী দিনের নীতি নির্ধারিত হয় এবং সেই নীতির প্রভাব পড়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা