প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৪ পিএম
আলী রীয়াজ। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে গণভোটের হার বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদ মর্যাদা) ও গণভোট-সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে গণভোটের হার বেশি ছিল।
শনিবার সকাল সোয়া ১১টায় বেইলি রোডস্থ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নোট অব ডিসেন্ট সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে অঙ্গীকার করেছিল এখন জনরায়ও এসেছে। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারা এগিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, বিএনপি ইতিপূর্বে বড় ধরনের সংস্কার করেছিল। এবারও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কারসহ গণভোটের প্রত্যাশা পূরণ করবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও গণভোটের হ্যাঁ বিজয়ী হয়েছে বলে জানান মনির হায়দার। তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমির ডা. শফিকু্র রহমান ও জাতীয় নারিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। সেজন্য গণভোট শুধু সরকারের কাজ না রাজনৈতিক রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়ে একে জয়যুক্ত করেছেন। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী গণভোটে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার, যা মোট ভোটের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এরমধ্যে মোট চার কোটি ৮২ লক্ষ ৬৬০ জন হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন, যা কাস্ট হওয়া মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। না ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন ভোটার, যা কাস্ট হওয়া ভোটের প্রায় ৩১ শতাংশ। লক্ষণীয় যে, ভোটারদের ৬০ শতাংশেরও বেশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন এবং তা জাতীয় সংসদের নির্বাচনের চেয়েও এক শতাংশের বেশি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকরা অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং দ্বিধাহীনভাবে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব সমূহের অনুকুলে তাদের রায় দিয়েছেন। এই রায় থেকে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চান না, তারা পরিবর্তন চান, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংস্কার চান। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘একটি জাতীয় রূপান্তর কখনওই একক সিদ্ধান্তে বা একক শাসনের মাধ্যমে টেকসই হবে না। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকেই। তাই দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক পথের মূল ভিত্তি। এই লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি। যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার দিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন।’ জনগণ তার আহবানে সাড়া দিয়েছেন। সংস্কারের পক্ষে জন রায় এসেছে।
গণভোটে দেওয়া জনগণের রায়কে কেবল সংখ্যার বিবেচনায় দেখলেই হবেনা। জনগণের এই রায় হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা অকুতোভয়ে লড়াই করেছেন তারা আমাদের ওপরে যে দায়িত্ব অর্পন করেছেন তার স্বীকৃতি; তাদের দেওয়া দায়িত্ব পালনের জন্যে জনগণের অঙ্গীকার। প্রায় ১৬ বছর ধরে যে বীরের রক্তস্রোত, মাতার অশ্রুধারা, নির্যাতিতের হাহাকার তার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের জনআকাঙ্খার প্রকাশ। সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায়ের যে প্রকাশ ঘটেছিল ২০২৪ সালের গনঅভ্যুথানের মধ্য দিয়ে তাই পুনর্বার এই রায়ে প্রকাশিত হল। আমাদের এই বিষয়গুলো বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটের প্রচার ও জনসচেতনতা তৈরির কাজে আমরা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও সমর্থন পেয়েছি তার জন্য আমার আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলসমূহ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, জনসমাজ বা সিভিল সোসাইটির সদস্য ও গ্রামাঞ্চলের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো প্রচারের কাজে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছেন। আমি বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাই জুলাই শহিদদের পরিবার, জুলাই যোদ্ধা, জুলাই রাজবন্দী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন, চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা। তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, সংগঠিতভাবে প্রচার চালিয়েছেন। আমাদের দপ্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে, অকুন্ঠ চিত্তে অতিরিক্ত সময় এবং শ্রম দিয়েছেন। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অফলাইনে, অনলাইনে অসংখ্য মানুষ প্রচার চালিয়েছেন।
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা ফারুকীর নেতৃত্বে তার সহযোগীরা প্রচার ভিডিও তৈরির মাধ্যমে অনলাইনে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং ভোটের গাড়ির মাধ্যমে তা গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের এই প্রচেষ্টা ছিল অভূতপূর্ব ও অভাবনীয়।
আলী রীয়াজ বলেন, মিডিয়ার কর্মীদের কাছে, সাংবাদিকদের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আপনারা গণভোটের খবর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন, আমাদের কাজের দুর্বলতার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন এবং আমাদের সাফল্যের দিক তুলে ধরেছেন। যারা গণভোটের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি নিয়ে আমাদের কাজের সমালোচনা করেছেন আমরা তাদের কাছেও কৃতজ্ঞ। সকলের কন্ঠস্বর-ইতিবাচক এবং নেতিবাচক- সকল কিছুই একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অপরিহার্য।
তিনি বলেন, গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের ব্যাপারে যে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলসমূহের। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারাবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দলসমূহ এবং সংসদের বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছেন তাদের সকলের প্রতি আহবান হচ্ছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যম ঐক্যবদ্ধভাবে এই গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সময় ভিন্নমতের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা রাজনৈতিক দলগুলো দেখিয়েছেন এবং আপস-সমঝোতার যে ঐতিহ্য রচনা করেছেন তা অব্যাহত রেখে আপনাদের প্রণীত জনরায় সমর্থিত এই দলিল বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের ওপরে অর্পিত হয়েছে। জনসমাজের প্রতি আহবান তারা যেন এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে সহযোগিতা করেন। আমার বিশেষভাবে তরুণদের প্রতি আহবান জানাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আপনাদের, সেই বাংলাদেশ গঠনের কাজে অগ্রণী হোন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সংসদ সদস্যদের এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিনন্দন জানাই। এছাড়া দীর্ঘদিন পরএকটি সত্যিকারের নির্বাচনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সকল ধরণেরষড়যন্ত্র ও সহিংসতার আশঙ্কাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী জনসাধরণকেও অভিনন্দন।