ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:১২ পিএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২৫ পিএম
ভোটের আগে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল-সুবিধা ত্যাগের উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন কয়েকজন উপদেষ্টা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা ভোটের আগে কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ (সবুজ) পাসপোর্ট ইস্যুর আবেদন করেছেন।
সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের
প্রয়োজনে তারা যে পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন, দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতির মধ্যেই সেই রাষ্ট্রীয়
প্রটোকল-সুবিধা এখন ত্যাগ করছেন।
এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায়
প্রশাসনিক মহলে এটিকে নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে; তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে
তা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আবেদনগুলো পৃথকভাবে করা হলেও সময়ের ব্যবধান অল্প, যা নির্বাচন-পূর্ব
প্রশাসনিক রদবদলের প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্তত পাঁচজনের কূটনৈতিক
পাসপোর্ট জমা ও সাধারণ পাসপোর্ট আবেদনের তথ্য তালিকায় উঠেছে।
এর মধ্যে স্থানীয় সরকার,
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব
ভূইয়া অন্যতম। তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট নং ডি০০০১৮১৮৫, আইডি নং ৪২০২০০০০১৬৮১৮। উপদেষ্টার
দায়িত্ব পালনের সুবাদে কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
আরেক উপদেষ্টা অধ্যাপক
ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তার
কূটনৈতিক পাসপোর্ট নং ডি০০০১৮৪৮৬ ও স্ত্রীর ডি০০০১৮৪৮৭। দায়িত্বকালীন প্রটোকল সুবিধা
হিসেবে তিনি ও তার স্ত্রী কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।
শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত
এবং পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমান দায়িত্বকালীন
প্রটোকল সুবিধা হিসেবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেন; যার নং ডি০০০১৯১৯৪, আইডি নং ৪২০২০০০১৭০০২।
প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়
খোদা বকস চৌধুরী প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টতা
দেখতেন। বিশেষ কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। দায়িত্বকালীন প্রটোকল সুবিধা হিসেবে
তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিতে ভুল করেননি; যার নং ডি০০০১৭৪১৭, আইডি নং ৪০১১০০০৬৯৯২০০।
বেশ কিছুদিন আগে তিনি পদত্যাগ করলেও তখন তার কূটনৈতিক
পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়নি।
খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের
উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। দায়িত্বকালীন প্রটোকল সুবিধা হিসেবে তিনিও কূটনৈতিক পাসপোর্ট
নেন; যার নং ডি০০০১৭৩৬২।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা
যায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য নিয়মিত
প্রক্রিয়ায় আবেদন করেছেন। কূটনৈতিক পাসপোর্ট পদ-নির্ভর। দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রীয়
কাজে বিদেশ সফর, ভিসা-প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও প্রটোকল সুবিধার জন্য এটি ইস্যু করা হয়।
দায়িত্ব শেষ হলে বা পদত্যাগের পর পাসপোর্টটি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক; এটি ব্যক্তিগত
সম্পত্তি নয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সূত্র বলছে, কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনো বিশেষাধিকার নয়; এটি দায়িত্বের আনুষঙ্গিক। দায়িত্ব
শেষ মানেই সুবিধা শেষ। আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ীও এ বিধান মানা হয়। অন্যদিকে সাধারণ
পাসপোর্ট ইস্যু একটি স্বতন্ত্র আবেদন। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানার তথ্য, পূর্ববর্তী
পাসপোর্টের রেকর্ড, প্রয়োজন হলে পুলিশ ভেরিফিকেশন-সবই প্রযোজ্য।
অর্থাৎ কূটনৈতিক পাসপোর্ট
‘রূপান্তর’হয় না; বরং নতুন ইস্যু হয়। তাই দায়িত্ব সমাপ্তির
আগে প্রটোকল-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা গুছিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রশাসনিক
হস্তান্তর, ফাইল নিষ্পত্তি ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ত্যাগ—এসবই প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের
মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে যেকোনো প্রতীকী পদক্ষেপই জনমনে বার্তা দেয়। কূটনৈতিক পাসপোর্ট
জমা দেওয়া ক্ষমতার প্রতীকী সুবিধা ত্যাগ।
এটিকে কেউ কেউ নিরপেক্ষতার
বার্তা হিসেবে দেখছেন। আবার সমালোচকেরা বলছেন, আবেদন-সময়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পদত্যাগপত্র
গ্রহণের তারিখ প্রকাশ না হলে জল্পনা বাড়ে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বলেন, নিয়ম মানা স্বাভাবিক। কিন্তু সময়টা যদি নির্বাচন-পূর্ব হয়, তবে স্বচ্ছতার মাত্রা
বাড়াতে হয়, না হলে প্রতীকী পদক্ষেপও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়,
আবেদন-তারিখ, পাসপোর্ট জমা দেওয়ার রসিদ, যাচাই-বাছাইয়ের অগ্রগতি—এসব তথ্য জনসমক্ষে নিয়মিত প্রকাশের চর্চা নেই। তবে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের
প্রটোকল সুবিধা গ্রহণ ও ত্যাগ—উভয় ক্ষেত্রেই সময়রেখা প্রকাশ করলে জনআস্থা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মত, দায়িত্ব
শেষের তারিখ ও পাসপোর্ট জমা দেওয়ার তারিখ প্রকাশ করা উচিত। সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর
অবস্থা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বুলেটিন এবং প্রটোকল-সুবিধা ব্যবস্থাপনার বার্ষিক প্রতিবেদন
দেওয়া উচিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,
দায়িত্ব শেষের পর কূটনৈতিক পাসপোর্ট রেখে দিলে তা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণে প্রটোকল-সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে দ্রুত ফেরত দেওয়া জরুরি। তবে
সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড় নেই। যাচাই-বাছাই একই নিয়মে হয়।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের
এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করা শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এটি কনভার্সন নয়;
সম্পূর্ণ নতুন আবেদন। নিয়ম লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। এই ঘটনার দুইটি স্তর রয়েছে- প্রথমত,
এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ। দায়িত্ব শেষের আগে প্রটোকল সুবিধা গুছিয়ে
নেওয়া স্বাভাবিক।
“দ্বিতীয়ত, সময়-নির্বাচনের
কারণে এটি প্রতীকী তাৎপর্য পেয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সুবিধা ত্যাগ জনমনে নিরপেক্ষতার
ইঙ্গিত হিসেবেও পড়তে পারে। নিয়ম মেনেই সবকিছু হচ্ছে। তবে জনআস্থা রক্ষায় তথ্যপ্রকাশের
মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা
যায়, সাবেক ও বর্তমান উপদেষ্টাদের আবেদনগুলো প্রক্রিয়াধীন। নির্ধারিত যাচাই-বাছাই শেষে
সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু হবে। দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হলে আরও কয়েকজন আবেদন করতে পারেন—এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া কূটনৈতিক পাসপোর্ট পদনির্ভর;
দায়িত্ব শেষ হলে তা ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের এই পদক্ষেপ
আইনসম্মত ও প্রটোকলসম্মত। কিন্তু নির্বাচন-পূর্ব সময়সীমায় একযোগে আবেদন—এটি প্রশাসনিক নিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতীকেরও জন্ম দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন
একটাই—নিয়ম মানা হয়েছে কি না? সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ;
তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে ও কতটা স্বচ্ছভাবে তা জানানো হচ্ছে। কারণ নির্বাচন-পূর্ব
সময়ের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপই জনআস্থার পরিমাপক হয়ে ওঠে।