× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদায়বেলায় ইউনূস সরকার: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মিলল কি?

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৯ পিএম

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:২৭ এএম

ঢাকার তেজগাঁওয়ে সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়মিত শেষ সভা। ছবি: পিআইডি

ঢাকার তেজগাঁওয়ে সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়মিত শেষ সভা। ছবি: পিআইডি

ব্যর্থতা, বিতর্ক আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির সংমিশ্রণে অধ্যায় শেষ করে বিদায় নিতে যাচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

ঢাকার তেজগাঁওয়ে সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সরকারের নিয়মিত শেষ বৈঠক।

প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এদিন সকাল সোয়া ১০টায় প্রথমে সচিব এবং পরে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আর কোনো বৈঠকের সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ফুঁসে উঠতে উঠতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেই ধাক্কাই ওই বছর ৫ আগস্ট পতন হয় দেড়যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের। এরপর তিন দিন দেশ ছিল সরকারহীন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্বে আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

গত ১৮ মাসের এই শাসনকাল শেষে এখন সচিবালয়জুড়ে বিদায়ের প্রস্তুতি। উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে তাদের সরকারি বাসভবন ছাড়া এবং কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট জমা দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন।

অনেক উপদেষ্টা ইতিমধ্যে তাদের সম্পদের হিসাব জমা দিলেও, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই এই বিবরণী প্রকাশ করা হবে।

রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া ইউনূস সরকারের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। তবে তার শাসনামলে সেই প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়েছে—তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক।

সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং টাকার পতন রোধের চেষ্টা ছিল এই সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা অগ্রগতি দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথাই বলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের দুই মাসেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আট মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে রয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিনিয়োগ বাড়েনি, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি প্রত্যাশিত হারে।

অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে ‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। সরকার এটিকে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, সমালোচকরা বলছেন—এতে প্রশাসনে নতুন করে বিভাজন তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদায়ের প্রাক্কালে সচিবালয়ে এখন স্পষ্টই বিদায়ের সুর। উপদেষ্টারা নিজ নিজ দপ্তরের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। বেশির ভাগ উপদেষ্টা ইতোমধ্যে তাদের কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ নতুন সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন, কেউ কেউ তা হাতে পেয়েও গেছেন। সরকারি বাসা ছাড়ার প্রক্রিয়াও চলছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার কোনো সরকারি বাসা নেননি, তবে পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সরকারি বাড়ি কিংবা কূটনৈতিক পাসপোর্ট-কোনোটিই নেননি।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী। দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে। কিন্তু মেয়াদ শেষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও তা প্রকাশ করা হয়নি। যদিও প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই এসব বিবরণী প্রকাশ করা হবে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনের নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। কিন্তু সময়মতো সম্পদের বিবরণী প্রকাশ না করায় সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে।

এরই মধ্যে নতুন সরকারের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি গাড়ি প্রস্তুত রেখেছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংসদ সদস্যদের শপথের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠিত হবে।

গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক প্রত্যাশা ও সুযোগ সামনে রেখে ক্ষমতা পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কেউ একে বলছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সরকার, কেউ বলছেন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ এক অধ্যায়। ইতিহাসই ঠিক করবে, এই সরকারের অর্জন আর ব্যর্থতার প্রকৃত হিসাব।

 

 

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা